বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩০ পূর্বাহ্ন
Headline
পিরোজপুরে সবুজ বিপ্লবের লক্ষ্যে: ৫ বছরে ১০ হাজার বৃক্ষরোপণের মেগা মিশন শুরু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো তিতাস গ্যাস,জরিমানা ১ লাখ ১৬ হাজার আজ থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ শুরু ব্যহত হতে পারে বনদস্যুদের কারণে মোটরসাইকেল বিক্রিতে মন্দাভাব,শোরুমের খরচ নিয়ে চিন্তিত ব্যবসায়ীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাড়ে ৩কোটি টাকার অবৈধ ভারতীয় পন্য জব্দ মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত আত্মনির্ভরশীল সমাজ গড়ার আহ্বান কৃষি পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা এনেছে ভুজপুর রাবারড্যাম অভিনেত্রীকে বাঁচাতে গিয়েই কি পানিতে ডুবে যান রাহুল? ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনায় ৩৯৪ প্রাণহানি, সবচেয়ে বেশি সড়কে এমপিওভুক্ত মহিলা শিক্ষকদের নিরব কান্না দেখার কেউ নেই

মব সন্ত্রাস বনাম উত্তরার রিকশা বিদ্রোহ !

✔গোলাম মাওলা রনি / ১৪ Time View
Update : বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬

ইচ্ছা ছিল ভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে লিখব, কিন্তু চলতি মার্চ মাসের ১৫ তারিখ রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকার একটি অভিজাত শপিং মলে যা ঘটল তা নিয়ে আলোচনা জরুরি বলে মনে করছি। আমাদের দেশের রিকশার মতো অদ্ভুত বাহন পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এত ব্যাপক সংখ্যায় নেই। বাংলাদেশের রিকশার আকার-আয়তন, রংচং এবং রিকশাওয়ালাদের অমানবিক পরিশ্রমের সঙ্গে পৃথিবীর অন্য কোনো পেশা এবং পেশাজাত যন্ত্রের মিল নেই। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লোকজন এমনকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরাও ইদানীং রিকশা চালাচ্ছে।

জীবন-জীবিকার সব দরজা যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন বুভুক্ষু নর-নারী রিকশা চালানোকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পা-চালিত সাধারণ রিকশার সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, যেগুলোকে লোকজন টিটকারী করে বাংলার টেসলা বলে থাকেন। ঢাকার রাস্তায় রিকশার আধিক্য এবং প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করবেন না, কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশার যে দাপট তা দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। আদিকালে ট্রাককে রাস্তার রাজা বলা হতো।

কিন্তু ট্রাকের সেই হম্বিতম্বি, হাঁকডাক টেসলার কাছে রীতিমতো মিউ অর্থাৎ বিড়াল হয়ে গেছে। সারা বাংলায় রিকশা বনাম ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রতিযোগিতা, ড্রাইভারদের মারামারি, সড়ক-মহাসড়কে প্রতিদিন অসংখ্য দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ আদমসন্তান আহত-নিহত হচ্ছেন এবং যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তা যদি নিরূপণ করা হতো তাহলে সবার পিলে চমকে যেত।
আজকের নিবন্ধে শ্রমজীবী মানুষদের হতাশা, ধৈর্যচ্যুতি এবং অস্থিরতার কুফল নিয়ে আলোচনা করব। উত্তরায় যে ঘটনাটি ঘটেছে তার প্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক জগতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে।

রাষ্ট্র হিসেবে আমরা রসাতলে চলে গিয়েছি এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ব্যাকরণ রয়েছে তা থেকে আমরা বিচ্যুত হয়ে গেছি। একজন রিকশাওয়ালার মৃত্যুর গুজবকে কেন্দ্র করে যেভাবে হাজার হাজার রিকশাওয়ালা জড়ো হয়ে সমগ্র উত্তরাকে অচল করে দিল এবং একটি অভিজাত শপিং মল ভেঙে চুরমার করল এবং সব মালামাল যেভাবে লুট হলো তা শুধু নজিরবিহীন নয়; বরং এমন ঘটনা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল।

উল্লিখিত ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য আপনি যদি মহামতি হজরত আলী (রা.)-এর একটি অমিয় বাণী পর্যালোচনা করেন তবে বুঝতে পারবেন, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা রসাতলের কোন পর্যায়ে রয়েছে। হজরত আলী (রা.) বলেন, একটি দেশ রসাতলে গেছে তা বুঝবে কিভাবে? যখন দেখবে দেশটির দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়ে পড়েছে। তিনি তাঁর বাণীতে আরো বলেন, যেখানে দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়ে যায় সেখানে ধনীরা কৃপণ হয়ে পড়ে।

আর ধনীদের কৃপণতার ফলে শাসনকর্মে অযোগ্য, অপদার্থ, চরিত্রহীন, লম্পটদের রাজত্ব শুরু হয়ে যায়। এখানে আমাদের দেশে গত তিন দশক ধরে জীবন-জীবিকা, মানবিকতা এবং নীতি-নৈতিকতার যে ক্রমবর্ধমান অবনতি চলছে তারই ধারাবাহিকতায় রিকশাওয়ালাদের তাণ্ডবে থানা পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, পথচারী এবং মার্কেটের ক্রেতা-বিক্রেতারা যেভাবে অসহায় হয়ে পড়লেন, তা আগামী দিনের জন্য বিরাট এক অশনিসংকেত।

বিগত আঠারো মাসের মবের রাজত্ব আপাতত শেষ হলেও মবের অপসংস্কৃতি শেষ হবে না। রাষ্ট্রশক্তি যদি তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারি, মেধা, সততা এবং কৌশল প্রয়োগ করে, তবে হয়তো সব নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিন্তু নির্মূল হবে না। কারণ এই পৃথিবীর কোনো জনপদে যদি মানুষের মধ্যে কোনো মন্দ আচরণ ঢুকে যায়, তবে তা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্যাথোলজিক্যাল বায়োলজি এবং নিউরোলজিক্যাল কেমিস্ট্রির মাধ্যমে বংশপরম্পরায় চলতে থাকে। এই পৃথিবীতে প্লেগ, গুটিবসন্ত, হামের মতো মহামারি রোগজীবাণু নির্মূল হয়েছে, কিন্তু হজরত আদম (আ.)-এর জামানা থেকে আজ অবধি মানবচরিত্র, চিন্তা ও চেতনায় যে পাপ যুক্ত হয়েছে তা নির্মূল হয়নি।

উপরোক্ত প্রাকৃতিক নিয়মের কারণে দেখবেন, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মানুষের আচরণ ভিন্নতর হয়। প্রকৃতি ও পরিবেশের কারণে মানুষের আকার, আকৃতি, আভিজাত্য, আহার-বিহারে ভিন্নতা থাকে। আদিকালে যে জাতি চুরি-ডাকাতিতে লিপ্ত ছিল তাদের যতই আধুনিক সভ্যতা, নিয়ম-কানুনের জালে আবদ্ধ করা হোক না কেন, তারা সামান্য সুযোগ পেলেই আদি পেশার মহড়া দেবেই। কয়েক বছর আগে লন্ডন শহরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ ছিল না। আর সেই সুযোগে লাখ লাখ দোকানপাট যেভাবে লুট হয়েছে তা বিশ্লেষণ করলেই বুঝতে পারবেন যে প্রায় ২০০ বছর ধরে দুনিয়া লুটপাটকারী ব্রিটিশদের শরীর, মন ও মস্তিষ্কের মধ্যে কিভাবে অপরাধের বীজ বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রিটিশদের উল্লিখিত চরিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে প্রখ্যাত ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং দার্শনিক জনাব শশী থারুর চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিতর্কে ব্রিটিশ বক্তারা গর্ব করে বলেছিলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কোনো এক সময় সূর্য অস্ত যেত না। উত্তরে শশী থারুর বলেছেন যে ব্রিটিশরা এমন এক ভয়ংকর জাতি, যাদেরকে স্বয়ং ঈশ্বরও বিশ্বাস করেন না। এই কারণে তাদের দিনের আলোয় রাখেন। কারণ রাতের অন্ধকার পেলেই তারা মন্দ কর্ম করে।

ব্রিটিশদের বাদ দিয়ে এবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। উত্তরার রিকশা বিদ্রোহ আমাদের জাতীয় জীবনের গত আঠারো মাসের মব সন্ত্রাসের ফসল। আগামীতে যদি খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষগুলো নিজ নিজ শ্রেণি-পেশাকে ব্যবহার করে মব সন্ত্রাস শুরু করে, তবে পিয়ন, ড্রাইভার ও দারোয়ানের ভয়ে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বা ভবনের মালিকরা কাজ করতে পারবেন না। শ্রমিকদের দাপটে কন্ট্রাক্টর কাজ বন্ধ করে দেবেন এবং ভিক্ষুকদের ভয়ে পথচারীরা থরথর করে কাঁপবেন। আর সেই সুযোগে দাগি আসামিরা ক্ষমতার মঞ্চে উল্লাসনৃত্য শুরু করবে।

উল্লিখিত অবস্থা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আদিকালে মহান রাজা-বাদশাহরা দার্শনিকদের সাহায্য নিতেন। রাজদরবারে দার্শনিকদের মর্যাদা ছিল সর্বোচ্চ। সেই বৈদিক যুগের ব্রাহ্মণতন্ত্র কিংবা প্রাচীন দুনিয়ার রাজদরবারে জ্ঞানী-গুণীকে নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের রত্ন বলে আখ্যায়িত করা হতো। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার থেকে শুরু করে প্রাচীন দুনিয়ার আলেকজান্ডার, হানিবল, দারায়ুস, শি হুয়ান টি, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, অশোক প্রমুখের রাজদরবারে ৯ জনের একটি দার্শনিক গ্রুপ সার্বক্ষণিক রাজাকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন, যাদের ঐতিহাসিক উপাধি ছিল নবরত্ন। প্রাচীন দুনিয়ার নবরত্ন থিওরি মধ্যযুগেও হুবহু অনুসরিত হতো বিশ্বের বড় বড় কিংবদন্তির রাজদরবারে। সম্রাট আকবর, বাদশাহ সুলাইমান, রানি প্রথম এলিজাবেথ প্রমুখ দুনিয়া কাঁপানো মহান শাসকবৃন্দ ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করছেন তাঁদের নবরত্নের কারণে।

স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে হাজার বছরের বাঙালি, ব্রিটিশ, পাকিস্তানি এবং তুকীি, বর্গি, মগ, ওলন্দাজ প্রভৃতি আক্রমণকারীদের সব বদ অভ্যাস পেয়েছি এবং মহা গৌরবে সংরক্ষণ, প্রজনন এবং বিস্তার ঘটিয়ে চলেছি। কিন্তু বাঙালির দর্শন, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি ভুলে গেছি। আমরা অতীশ দীপঙ্কর, ফা হিয়েন ইবনে বতুতা, উইলিয়াম হান্টার, স্যার উইলিয়াম জোনস, আল্লামা ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল প্রমুখের দর্শন ভুলে ডাকাত শহীদ, মুরগি মিলন, চোট্টা বাবু, চাকু মহিউদ্দিন, বাস্টার্ড সেলিম, কালা জাহাঙ্গীদের দর্শন এমনভাবে আত্মস্থ করেছি, যা ২০২৬ সালের মার্চ মাসের ১৫ তারিখ রাতে রাজধানীর উত্তরার শপিং মলে রিকশা বিদ্রোহ রূপে নতুন অধ্যায় শুরু করল।

লেখক: রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক


এ বিভাগের আরও সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর