১৯০৪ সালের ঢাকার ধোলাইখাল
১৯০৪ সালের ধোলাইখাল,ধোলাই খালের উপর এই লোহার পুল,যার বয়স এক শতাব্দীরও বেশি,সে শুধু ক’টা ইস্পাতের কাঠামো নয়, সে হলো এক জীবন্ত সাক্ষী। এই ছবিটি যখন তোলা হয়েছিল, সালটা ১৯০৪। ঢাকা শহর তখন ঘুম ভাঙা এক কিশোরীর মতো, আস্তে আস্তে সেজে উঠছে।
পুলটার দিকে তাকানপাশে শক্ত পাথরের গাঁথুনি, মাঝখানে তির তির করে কাঁপা তারের বাঁধন। নিচে ধোলাই খাল, এখনকার মতো শীর্ণ নয়, তখন সে ছিল আরও প্রাণবন্ত। খাল দিয়ে ছোট ছোট নৌকা যেত, পাল তুলে নয়তো বৈঠার ছপ ছপ শব্দে। মাঝি হাঁক দিত, আর ঢেউগুলো শান্তভাবে দু’পাশের মাটির পাড়ে লুটিয়ে পড়ত।
পুলটার ওপর দেখুন! কী ভিড়! কিন্তু আজকের মতো ব্যস্ততা নেই তাতে। মানুষজন হেঁটে চলেছে, তাদের চালচলনে এক ধরণের স্থিরতা। হয়তো ওনারা ফার্সিগঞ্জ থেকে গেন্ডারিয়ার দিকে যাচ্ছেন, কিংবা আসছেন শাঁখারিবাজারের পথে।
কেউ মাথায় করে নিয়ে চলেছে ডাল-ভাতের চাল, কেউ কাঁধে গামছা ফেলে গল্প করতে করতে যাচ্ছে। মেয়েদের পরনে চওড়া পাড়ের শাড়ি, ছেলেদের গায়ে ফতুয়া বা আচকান। তাদের পায়ে নেই আধুনিক জুতো, ধুলো মাখা খালি পায়ে বা চটিতেই তাদের পথচলা। সেতুর প্রতিটি তার যেন শত শত মানুষের পায়ের স্পর্শে গুনগুন করছে এক পুরোনো দিনের গান।
সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো খালের ধারে, নিচে। শুকনো পাড় ধরে একজন মানুষ, হয়তো সেদিনের ঢাকা শহরের কোনো সাধারণ বাসিন্দা নদীর ধারে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। শান্ত, সবুজ বনানীর ছায়া পড়েছে খালের ঘোলাটে জলে। তখনো ইট-পাথরের জঙ্গল এমন করে শহরটাকে গিলে খায়নি। বাতাস ছিল শুদ্ধ, আর সন্ধ্যা নামতো জোনাকিদের আলো নিয়ে।
আজ হয়তো এই খাল প্রায় বিলীন, সেতুর জায়গায় হয়তো আধুনিক কোনো ব্যস্ত সড়ক। কিন্তু এই ছবিটা, এই লোহার পুলটা, আজও আমাদের কানে ফিসফিস করে বলে যায় সেই সময়ের কথা যখন জীবন ছিল সরল, পথচলা ছিল ধীরে, আর প্রতিটি দিন কাটত প্রকৃতির খুব কাছাকাছি। এই পুল শুধু দু’পাড়ের মানুষের মিলনক্ষেত্র ছিল না, এ ছিল ঢাকা শহরের স্নেহময় আলিঙ্গন।












