স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকাতে পারবেন স্ত্রী?
আমার কাছে প্রায়ই এমন অসহায় নারীরা আসেন, যাদের মনের মধ্যে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে এক চাপা ভয় কাজ করে। স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন- এমন খবর পেয়ে তারা ভীত এবং ক্ষুব্ধ। হয়তো সেই খবরটা উড়ো বা ভিত্তিহীন। তবুও সেই খবরে তার যেন পুরো পৃথিবীটা এলোমেলো হয়ে পড়ে।
তারা মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করেন, “আইন কি তাদের এই বিয়ে ঠেকানোর কোনো সুযোগ দেয়নি? নাকি স্বামী চাইলেই না জানিয়ে বা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আবার বিয়ে করতে পারেন?” অনেক নারীই মনে করেন, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকানোর কোনো আইনি পথ নেই, কারণ ‘পুরুষ চার বিয়ে করতে পারে’- এই ধারণাটি আমাদের সমাজে প্রচলিত।
কিন্তু তারা জানেন না যে, ধর্মীয় অনুমোদন থাকলেও, বাংলাদেশের পারিবারিক আইন একজন প্রথম স্ত্রীর অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সুরক্ষিত করেছে। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের বিরুদ্ধে প্রথম স্ত্রীর আইনি অবস্থান কী? স্ত্রী কি শুধু নীরব দর্শক হয়ে থাকবেন, নাকি তিনি সত্যিই এই বিয়ে ঠেকানোর জন্য পদক্ষেপ নিতে পারেন? চলুন, এই বিষয়ে বাংলাদেশের আইন কী বলছে এবং স্ত্রীর করণীয় কী, তা স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যাক।
আইনগত ব্যাখ্যা: দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকানোর স্ত্রীর অধিকার
বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, স্বামী চাইলেই প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন না।
আইনি বাধ্যবাধকতা-
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুসারে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিসি পরিষদের কাছে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবে না। সালিসি পরিষদ প্রথম স্ত্রীর কাছে লিখিত অনুমতি বা সম্মতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ের আবেদন বিবেচনা করবেন।
এ আবেদনে অন্যান্য যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে- ১. বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব ২. মারাত্মক শারীরিক দুর্বলতা ৩. দাম্পত্যজীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা ৪. দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য আদালত থেকে প্রদত্ত কোনো আদেশ বা ডিক্রি বর্জন ও ৫. মানসিকভাবে অসুস্থতা ইত্যাদি। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়।
কোনো পুরুষ যদি সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি অবিলম্বে তাঁর বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের আশু বা বিলম্বিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে। বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীরা আদালতে মামলা করে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করার অধিকার রাখেন।
দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে প্রথম স্ত্রী আলাদা বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি ভরণপোষণ পাবেন। এ ক্ষেত্রে নাবালক সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে হবে বাবাকে। ভরণপোষণের পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানদের উত্তরাধিকারীর অধিকার কোনো অবস্থাতেই খর্ব হবে না।
স্ত্রীর ভূমিকা: স্ত্রী যদি অনুমতি দিতে না চান, তবে তিনি সালিশি পরিষদের কাছে তার আপত্তি যৌক্তিক কারণে তুলে ধরতে পারেন।
দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকানোর উপায়:
যদি স্ত্রী জানতে পারেন যে স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ের উদ্যোগ নিচ্ছেন, তবে স্ত্রী অবিলম্বে সালিশি পরিষদে (স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান/মেয়রের কাছে) আবেদন করতে পারেন এবং স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের উদ্যোগে আপত্তি জানাতে পারেন।
নিষেধাজ্ঞা: স্ত্রী পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে ঠেকানোর জন্য নিষেধাজ্ঞার (Injunction) আবেদনও করতে পারেন। আদালত পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্বিতীয় বিয়ের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন।
পরিণতি ও শাস্তি: যদি স্বামী সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি ফৌজদারি অপরাধ করেন এবং তার এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এছাড়াও দণ্ডবিধির আওতায় মামলা করার সুযোগ রয়েছে। সেখানে শাস্তিরও ভিন্নতা আছে। সেটা নিয়ে অন্যদিন আলোচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, এখানে বাংলাদেশের আইনের আলোকে আলোচনা করা হল। যা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য।
আপনার জন্য পরামর্শ:
আইনকানুনগুলো একই হলেও, প্রতিটি ঘটনার পেক্ষাপট সাধারণত ভিন্ন হয়। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অবশ্যই একজন দক্ষ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনে অতি প্রয়োজনীয় আইনকানুন জানতে এবং আরও আইনি পরামর্শ পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।
সম্ভব হলে শেয়ার করে আপনার বন্ধু-স্বজনদেরও এ বিষয়ে সচেতন করুন।
Advocate Maminul Alam Russel












