কথায় কথায় আজ সারাদিন
।।কানিজ ত্বন্বী।।
আমার খেজুর গাছের ঠিক পিছনের বাড়িটা আমার ওমানের প্রতিবেশী।এই একটা বাড়ির লোকজন ছাড়া আমি আশেপাশের কাউকেই চিনিনা এমনকি একনজর চেহারাও দেখিনি এমন। এই বাসার ভিতরেও আমি কখনো যাইনি কিন্তু এই বাসার বাচ্চা গুলো সপ্তাহে ছুটির দিন আর হাফ ডে তে আমার পার্কিং স্পেসে এসে খেলাধুলা করতো। সেভাবেই ওদের চেনা।
মোট ১১ জন ভাইবোন আমার উঠানে খেলতে আসতো। ওদের কাছে বাঙ্গালী দেখা মানে অনেকটা এলিয়েন দেখার মতো। অনেক কথা বলতে ইচ্ছা হতো কিন্তু সমস্যা একটাই ওরা আমার ইংরেজি বোঝে না আর আমি ওদের আরবি ভাষা বুঝি না। আমাদের দেশে গ্রামগঞ্জের স্কুলগুলোতে যেমন ইংরেজি শিহ্মাতে তেমন জোর দেয় না। ওমানের মফস্বল শহর গুলোতেও এমন।
কিন্তু ওরা ছোট ছোট ইংরেজি যেমন – name, brother, mother, sister, son, daughter, food,school, work এমন শব্দের মানে বুঝতো।
এভাবেই কোডওয়ার্ড ব্যবহার করে আমি ওদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতাম।
ওদের নাম গুলো ছিল বেশ কঠিন। ঠিক মতো উচ্চারণ না করা পর্যন্ত পিছন ছাড়তো না। উচ্চারণ করিয়েই ছাড়তো। আর আমার নাম তন্নি শুনে সব গুলোর কি হাসি। আমাদের দেশে যেমন আনকমন নাম রাখতে গিয়ে উচ্চারণ করা যায় না এমন নাম রাখে ওদেরও হয়তো এমনই।
প্রতি শুক্রবারে ওদের বাবা আসতো। বৃদ্ধ রোগা-সোগা একটা লোক। বাবার গাড়ি দেখা মাত্রই বাচ্চাগুলো জান প্রান নিয়ে দৌড়ে পালাতো। সম্ভবত ভয় পায় বাবা কে। গাড়ি থেকে বড় বড় আটার বস্তা চালের বস্তা বাজার নামিয়ে রেখে যেতেন।
একদিন বাচ্চাগুলো কে জিজ্ঞেস করলাম তাদের সবার কার কত বয়স। তারা যথাক্রমে বলতে শুরু করলো ৪,৪,৫,৫,৫,৬,৭,৭,৯,১১,১২। দেখলাম দুই তিনজনের একি বয়স। জিজ্ঞেস করলাম twins? বলে no বললাম cousin’s?? বলে no. কি মুশকিল জমজও না আবার চাচাতো ভাইবোনও না। তাহলে ৩ জনের কিভাবে ৫ বছর বয়স হয়। কি এক মহাজোট লেগে গেলো। কেউ কাউকে কিছুই বোঝাতে পারছি না। তারমধ্যে সবার বড় মেয়েটি দৌড়ে বাসায় গেলো আর একটা বড় মেয়েকে ডেকে নিয়ে আসলো।
মেয়েটি ভালো ইংরেজি জানে। সে বললো ওরা সবাই ভাই বোন কিন্তু তিন মায়ের সন্তান। সে সবার বড় তার ছোট ১৪ জন। কিন্তু বাবা এখানে থাকেন না। বাবা থাকে ৪ নাম্বার স্ত্রীর সাথে অন্য বাসায়। সেই ৪ নাম্বার স্ত্রীর ১ জন ছেলে। বাবা সপ্তাহে একদিন এসে সবার বাজার করে দিয়ে জান। এই বাড়িতে ৩ মা সহ মোট ১৫ জন ভাইবোন থাকে। ভাবা যায় একটা বাড়িতে ৩ বউ আর এতোগুলা বাচ্চা। বাংলাদেশ হলে তো প্রতিদিন চুলাচুলি হতো। কিন্তু কত সুন্দর মিলেমিশে থাকে।
শুনে খুব ভালো লাগলো। আসলে আরব দেশে একজনের ৩/৪ টা বউ থাকা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু যেটা খারাপ লেগেছে সেটা হলো উনি এখানে ৩ স্ত্রী কে শুধু ভাত কাপড়ের খোরাকের উপর ফেলে রেখে ৪র্থ স্ত্রীর সাথে বসবাস করছেন। যাই হোক এটা তাদের পারিবারিক ব্যাক্তিগত ব্যাপার। স্ত্রীরা মেনে নিলে সন্তানরা মেনে নিলে আর কোনো কথা নেই।
এরপর থেকে প্রতিদিন বাসার গেইটে দাড়িয়ে মেয়েটার সাথে কথা বলি গল্প করি। তারমধ্যে একদিন ৩ নাম্বার মায়ের আরও একটি বাচ্চা হলো ছেলে বাচ্চা। সেদিন ওদের বাবা খাশি জবাই দিয়ে বিরিয়ানি করে প্যাকেট বিতরণ করলেন।
একদিন মেয়েটা কে জিজ্ঞেস করলাম বাবা যে এখানে থাকেন না কোনো অসুবিধা হয় না? বলে এটায় তারা অভ্যস্ত। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম তুমি বিয়ে করবে না? বলে আমার বিয়ে হয়ে গেছে কিন্তু তালাকের কার্যক্রম চলছে। খুব খারাপ লাগলো এতো লহ্মি একটা মেয়ের তালাক হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম কারণ টা জানা যাবে? মেয়েটা বললো বিয়ের ৪ দিন পর জানতে পারি আমার স্বামীর আরও একজন স্ত্রী আছে। অথচ বিয়ের আগে বলেছিলেন এটা উনার ভাবি। পরে জানলাম এই বউ বাচ্চা উনার। সে কথা মেয়েটার বাবা জানার পর জামাই কে দুই বউ কে আলাদা বাড়িতে রাখতে বলে। কিন্তু স্বামী সেই প্রস্তাবে রাজি না হলে বাবা মেয়েকে ফিরত নিয়ে আসে।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম – সেদিনে আমার একটা শিহ্মা হলো। তা হলো পুরুষ স্বামী হিসাবে যেমন তেমন কিন্তু পিতা হিসাবে সবসময় শ্রেষ্ঠ।
গতকাল আমার সাহেব বললো ভদ্রলোক মারা গেছেন। খুব চিন্তায় পড়লাম ৪ জন স্ত্রী এতোগুলা বাচ্চার দায়িত্ব কে নিবে? সাহেব বললো ওই দেশের সরকার অনেক সাহায্য করে। আর ভদ্রলোকের যথেষ্ট সম্পত্তি আছে।
আচ্ছা সম্পত্তি আর সাহায্য দিয়ে জীবন চলে? ৬০ বছর বয়সেও এতোগুলা বাচ্চা জন্ম দিয়ে তারপর মারা গিয়ে সবাইকে সহায়সম্বলহীন করে রেখে যাওয়া টা কতটুকু যুক্তিসম্মত?? বউ গুলোর বয়স কম বাচ্চা কয়েকটি ২/৩ বছরের। এগুলো কি শুধু সাহায্যের উপর নির্ভর করে বাকি জীবন কাটিয়ে দিবে?












