এ ধ্বংসজঞ্জ থামবে কবে?
আজ সকালে ই স রা য়ে ল ইরানে বিমান ও ক্ষেপনাস্ত্র হামলা করেছে। অনুমিতই ছিল যে কোনো সময় হামলা হবে। যু ক্ত রাষ্ট্র ইরানে হামলা করার জন্য গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রণপ্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকন, রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড ইরানী জলসীমায় মোতায়েন রয়েছে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনের সামরিক ঘাটিগুলো থেকে সৈন্য বাদে তাদের সকল পরিবার-পরিজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে মার্কিন ও ই স রা য়ে লি নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া দেখে অনুমান করা যাচ্ছিল যে কোনো সময় হামলা হতে পারে। সেটাই আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি হলো।
◾️
প্রেক্ষাপটঃ
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর দমনে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবর অনুযায়ী নিহত হয়েছিলেন ৩১১৭ জন। তবে মানবাধিকার সংস্থা ও অন্যান্য সূত্রের দাবি এই সংখ্যা ৫০০০ থেকে ২০০০০-এর বেশি। ইরানের শহিদ ফাউন্ডেশন এর মতে ২৪২৭ বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ মোট ৩১১৭ জন মারা গেছেন। জাতিসংঘের তথ্যে ৫০০০ থেকে ২০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিক্ষোভকে ১৯৭৯ সালের পর ইরানের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ বলা হচ্ছে।
◾️
আজ শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ই স রা য়ে ল এবং মার্কিন যু ক্ত রা ষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের সামরিক হামলা শুরু করেছে। ই স রা য়ে লি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এই অভিযানকে “আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা” হিসেবে অভিহিত করেছেন। হামলার প্রধান টার্গেট- তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কার্যালয় এবং বাসভবনের কাছে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডারদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
শনিবার ভোরে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন স্থানে আকাশ ও সমুদ্রপথে এই হামলা চালানো হয়। তেহরানের উত্তর ও পূর্ব অংশ জ্বলতে দেখা গেছে।
◾️
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ই স রা য়ে লে র সাথে মিলে এই যৌথ হামলার কথা নিশ্চিত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিসহ “অস্তিত্বের হুমকি” দূর করতে এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
পাল্টা সতর্কতা হিসাবে ইরান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় ই স রা য়ে ল জু ড়ে সাইরেন বেজে ওঠে এবং দেশটিতে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গত কয়েক সম্পাহ ধরেই ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্ব সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বাঙ্কার থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন বলে আভাস ছিল।
◾️
প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির খবরের সত্যতা প্রমাণিত না হলেও ই স রা য়ে ল থেকে বলা হয়েছে―ইরানি নেতৃত্বের ওপর চালানো এই হামলায় তারা “বড় ধরনের সাফল্য” অর্জন করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী হামলায় ইরানের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা দিয়েছেঃ
ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান নি/হ/ত, পরমাণু চুল্লিতে মুহুর্মুহু ক্ষেপনাস্ত্র হামলা, প্রধান পরমাণু বিজ্ঞানী নি হ ত এবং পূর্ব তেহরান ধ্বংসস্তুপে পরিণত। এই খবরগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
◾️
গভীর প্রেক্ষপটে ইসরায়েলের এই হামলা এবারই শুরু নয়, আবারই শেষও নয়। তাদের দীর্ঘদিনের “গ্রেটার জ্যুইসল্যান্ড” গঠনের স্বপ্নের অন্যতম বাধা ইরান। এক ইরান বাদে মধ্যপ্রাচ্যের বাদবাকি প্রায় সকল দেশকেই তারা ‘ইসরায়েলনির্ভার মিত্র’ বানিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে জর্ডান, মিশর, ওমান, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। মিশর ও জর্ডান তাদের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে কোনো কারণেও সেখান থেকে সরে আসবে না।
◾️
ইরানের রিটালিয়েশনঃ
ই স রা য়ে ল ও যুক্ত রা ষ্ট্রের যৌথ হামলার পর ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করে পাল্টা জবাব দিয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এই অভিযানকে “ট্রু প্রমিজ ৪” হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরান একসঙ্গে ই স রা য়ে লে র অভ্যন্তরে তেল আবিব শহরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং কিরিয়া সামরিক সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। উত্তর ই স রা য়ে লে র হাইফা এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনের অন্যান্য এলাকায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। জেরুজালেমের আকাশে একাধিক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। যদিও ই স রা য়ে ল দাবী করেছে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেগুলো রুখে দিয়েছে।
◾️
একই সময়ে ইরান বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। কাতারের আল উদেদ বিমান ঘাঁটি যা এই অঞ্চলের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক স্থাপরা, সেটা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।, যা পরে বাধা দেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি ও দুবাইয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে। দুবাইয়ে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েতের আকাশসীমাযয়ও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে। জর্ডান তার আকাশসীমায় দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করেছে।
◾️
ইরানের এই পাল্টা হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। ইরান আগে থেকেই সতর্ক করে আসছিল; ইরান যদি আক্রান্ত হয় তাহলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের সকল মার্কিন ঘাটিতে হামলা করবে। সেটা যে কথার কথা নয়, তা যু ক্তরা ষ্ট্র ও ই স রা য়ে ল বুঝেই ওইসকল অঞ্চল থেকে তাদের বেসামরিক লোকজন সরিয়ে নিয়েছে। হামলা মোকাবেলা করার জন্য এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম শক্তিশালী করেছে।
◾️
ইরানের পাল্টা হামলায় আশেপাশের দেশগুলোতে কয়েকজনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ই স রা য়ে লে র উত্তরাঞ্চল এবং জেরুজালেমের কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেল আবিবের কিরিয়া সামরিক সদর দপ্তর লক্ষ্য করে চালানো হামলায় এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট নিহতের কোনো সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি।
◾️
আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদিআরব, ওমান, জর্ডানের পর দক্ষিণ ইরাকের একটি সামরিক ঘাঁটিতেও বোমা হামলায় কমপক্ষে ২ জন যোদ্ধা নিহত এবং ৫ জনকে আহত করেছে ইরান।
◾️
এই পাল্টাপাল্টি হামলায় কে কার কতজনকে হ/ত্যা করেছে সেই খবরের সত্যতা মিলুন না মিলুক পরিস্থিতি যে মারাত্মকরকম ঘোলাটে হয়ে উঠেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের এই হামলা-পাল্টা হামলা খুব দ্রুত আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
◾️
স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে ওমানের দুটো ভারতীয় ঘাটি থেকে মার্কিন-ই স রা য়ে লি বিমান রিফুয়েলিং করেছে। আরও স্পষ্ট করে বললে মার্কিনের হামলা আরও জোরালো হলে তারা সরাসরি পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করবে। এবং পা কি স্তা নে র ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সেটা দিতে বাধ্য।
◾️
এই যুদ্ধে ‘হারাধনের দ্বিমুখি ছেলে’ বাংলাদেশের কি ভূমিকা?
কিচ্ছু না। স্রেফ কিসসু না। এখানে তৌহিদী জনতা নামক উগ্রবাদীরা ইরানের পক্ষে তীব্র স্লোগানমুখর প্রতিবাদী’ হয়ে ই স রা য়ে ল বিরোধীতা করবে, কিন্তু ভুলেও মার্কিনের নাম নেবে না। মার্কিন ডিপস্টেটের টাকা খেয়ে দেশ বিক্রি করা নেতা ও সুশীলরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ‘যুদ্ধ কারও উপকার করে না’ টাইপ মেনিমুখো কথা বলবে, কিন্তু কোনোভাবেও সরাসরি মার্কিন যে অপরাধ করছে সেটা বলবে না।
◾️
তবে নবনির্বাচিত সরকারের বিপদ বাড়বে। ইতোমধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। হামলার খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৩% বেড়ে ৭৩ ডলারের উপরে উঠে গেছে, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, কেননা বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০% ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথটি বাধাগ্রস্ত হলে তেলের দাম চরম মাত্রায় বেড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হবেই। যদিও হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারে ধস নামলে বাংলাদেশের তেমন ক্ষতি না হলেও বাংলাদেশের বাজারেও ধস নামবে। এর সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি অবশ্যম্ভাবী।
©️Monjurul Haque












