বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৮০–এর দশক ছিল স্বৈরশাসনবিরোধী সংগ্রামের এক রক্তাক্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল একযোগে আন্দোলনে নামলেও নেতৃত্বের ভূমিকা, কৌশল ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ঘটনা ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
এই সময়কালে পুলিশের গুলিতে বহু রাজনৈতিক কর্মী নিহত হন। বিশেষ করে ১৯৮৭–৮৮ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। চট্টগ্রামে ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ সালের সমাবেশে গুলিতে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা এ আন্দোলনের এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। নিহতের সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও, এটি যে একটি বড় হত্যাকাণ্ড ছিল—সে বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি ঘটনা আজও রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যতিক্রমী হিসেবে উঠে আসে। প্রচলিত বক্তব্য অনুযায়ী, এরশাদ সরকারের গুলিতে আওয়ামী লীগের একটি সমাবেশে বহু মানুষ নিহত হওয়ার পর ঢাকায় বিচার দাবিতে একটি মিছিল হয়। সে সময় শেখ হাসিনা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না—এমন দাবি প্রচলিত রয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়, খবর পেয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সেখানে উপস্থিত হয়ে মিছিলটির নেতৃত্ব দেন। যদিও এই ঘটনার দলিলভিত্তিক প্রমাণ সর্বত্র সমান নয়, তবু এটি বিরোধী ঐক্য ও মানবিক দায়িত্ববোধের একটি প্রতীকী দৃষ্টান্ত হিসেবে রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছিল দৃশ্যমান ও সক্রিয়। গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন ও প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি মাঠের রাজনীতিতে ছিলেন দৃঢ়। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই সম্মিলিত আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি আসে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে, যার মাধ্যমে এরশাদ শাসনের পতন ঘটে।
এরপর আসে ১৯৯১ সাল—যা কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তরের মুহূর্ত। ওই বছরের সাধারণ নির্বাচন ছিল বহুদলীয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদের আস্থা নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই কারণেই তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বলা হয়।
এর আগে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সংসদীয় কাঠামো থাকলেও, ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় দেশ শাসিত হয়েছে সামরিক ও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। জনগণের অবাধ ভোটাধিকার ও কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র তখন অনুপস্থিত ছিল। ফলে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা একটি ঐতিহাসিক অর্জন।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা, সংসদকে কার্যকর করা এবং বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিসর সম্প্রসারণ—এই পদক্ষেপগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুন করে ভিত্তি দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ক্ষমতা অর্জিত হয়েছিল গণআন্দোলন ও জনগণের রায়ের মাধ্যমে—কোনো সামরিক ফরমান বা ক্ষমতার উত্তরাধিকার হিসেবে নয়।
এই বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়াকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বলা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি ইতিহাসের একটি স্বীকৃত ও যুক্তিনিষ্ঠ পাঠ। গণতন্ত্রের ইতিহাসে তাই তাঁর নাম কেবল একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়,বরং একটি ইতিবাচক গণতান্ত্রিক নব অধ্যায়ের সূচক হিসেবেই স্মরণীয় থাকবে।
ক
।।লেখক:প্রকৌশলী,কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সমসাময়িক বিষয় বিশ্লেষক।।
নির্বাহী সম্পাদক-জাফর মাতুব্বর, সহ-সম্পাদক-মোঃআমিনুল ইসলাম
Mobile: +8801611-118649, +8801622-356873,
E-mail: newsajsaradin@gmail.com,ajsaradin24@gmail.com
©নকশী হ্যান্ডিক্রাফট বিডি লিমিটেড এর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। ১০৯,গ্রীণ রোড,ফার্মগেইট, ঢাকা-১২০৫ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।