অপশাসনের হাত থেকে দেশভূমি উদ্ধার আন্দোলন থেকে নবধারার গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন খালেদা জিয়া-গণশিক্ষা থেকে গণতন্ত্রের চর্চার প্রবর্তক

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিচ্ছেদ্য নাম।

তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বে দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। অনেকে হয়তো বলবেন—আপনি চলে গেছেন।

কিন্তু যারা তার নেতৃত্বের সময়কাল,সংগ্রাম ও ত্যাগের রাজনীতি প্রত্যক্ষ করেছে,তারা কখনোই বলবে না—বেগম জিয়া চলে গেছেন।
খালেদা জিয়া একমাত্র সেই নাম,যার ঠিকানা একমাত্র কেবল বাংলাদেশ।

তিনি গণতন্ত্রের জন্য পথচলা শিখিয়ে গেছেন।কোটি মানুষের মাঝে আপসহীন সংগ্রামের নীতি ও আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছেন।শিখিয়েছেন—এই দেশকে ভালোবাসতে হলে,এ দেশের মানুষকেই ভালোবাসতে হবে।পার্থিব জীবনে জন্ম মানেই মৃত্যু,কিন্তু সেই মৃত্যুর মাঝেই থাকে অমরত্ব।
আজ আমরা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী,মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পর উচ্চারণ করতে পারি—খালেদা জিয়া নামটি।আপনি অমর হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে।



বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৮০–এর দশক ছিল স্বৈরশাসনবিরোধী সংগ্রামের এক রক্তাক্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল একযোগে আন্দোলনে নামলেও নেতৃত্বের ভূমিকা, কৌশল ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ঘটনা ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
এই সময়কালে পুলিশের গুলিতে বহু রাজনৈতিক কর্মী নিহত হন।বিশেষ করে ১৯৮৭–৮৮ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। চট্টগ্রামে ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ সালের সমাবেশে গুলিতে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা এ আন্দোলনের এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। নিহতের সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও, এটি যে একটি বড় হত্যাকাণ্ড ছিল—সে বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি ঘটনা আজও রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যতিক্রমী হিসেবে উঠে আসে। প্রচলিত বক্তব্য অনুযায়ী, এরশাদ সরকারের গুলিতে আওয়ামী লীগের একটি সমাবেশে বহু মানুষ নিহত হওয়ার পর ঢাকায় বিচার দাবিতে একটি মিছিল হয়। সে সময় শেখ হাসিনা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না—এমন দাবি প্রচলিত রয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়, খবর পেয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সেখানে উপস্থিত হয়ে মিছিলটির নেতৃত্ব দেন।যদিও এই ঘটনার দলিলভিত্তিক প্রমাণ সর্বত্র সমান নয়, তবু এটি বিরোধী ঐক্য ও মানবিক দায়িত্ববোধের একটি প্রতীকী দৃষ্টান্ত হিসেবে রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছিল দৃশ্যমান ও সক্রিয়।গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন ও প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি মাঠের রাজনীতিতে ছিলেন দৃঢ়।একই সঙ্গে শেখ হাসিনাও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই সম্মিলিত আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি আসে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে, যার মাধ্যমে এরশাদ শাসনের পতন ঘটে।
এরপর আসে ১৯৯১ সাল—যা কেবল একটি নির্বাচন নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তরের মুহূর্ত। ওই বছরের সাধারণ নির্বাচন ছিল বহুদলীয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদের আস্থা নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই কারণেই তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বলা হয়।
➤কিছু বিপ্লবী কর্মসূচি যা খালেদা জিয়ার মতো নেত্রীর সাহসিকতার উদাহরণ হিসেবে ইতিহাস তার পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখবেই
◑বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া—বাংলাদেশের রাজনীতির এক অপরাজেয় অধ্যায়।১৯৪৫ সালে দিনাজপুরের জলপাইগুঁড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা, স্বামী শহীদ জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষায় অংশ নেন,আর পরে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের পর রাজনৈতিক মঞ্চে নিজের স্থান তৈরি করেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং দুই দফায় (১৯৯১‑১৯৯৬, ২০০১‑২০০৬) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন, যা তাকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী মহিলা নেত্রী করে তোলে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ছিল গণতন্ত্র,জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের অধিকার রক্ষার অটল প্রতিশ্রুতি। তাঁর নেতৃত্বে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়, নারী শিক্ষার বিস্তার ঘটে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আরও শক্তিশালী হয়।জীবনের এই সব উত্থান‑পতন সত্ত্বেও খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যায়ের সাথে আপোষহীন ,তাঁর অনুসারীরা আজও তাঁকে “মাতৃতুল্য নেত্রী” হিসেবে শ্রদ্ধা করেন।
স্বামী জিয়াউর রহমানের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে,যা তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়কে আরও ঐতিহাসিক করে তুলেছে।খালেদা জিয়ার জীবন—সংগ্রাম, সাহস এবং আপোষহীনতার এক মহাকাব্য—আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করে চলবে।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবন সংগ্রাম, গণতন্ত্রের জন্য অবিরাম লড়াই এবং সামাজিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা ভবিষ্যত প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
উল্লেখ্য ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যার পর, খালেদা জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এই সময়ে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাপক জনসমর্থন আদায় করেন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেন, যার ফলে তিনি প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা,যা শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিলো।এটি তার সাহসী ও চ্যালেঞ্জিং নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।শিক্ষার আলোয় একটা জাতিকে আলোকিত করতে পারলে সে জাতি মাথা উচু করে বিশ্বের দরবারে দ্বাড়াতে পারবে এই চিন্তাচেতনা এমন মহীয়সী নারীই ধারণ করেছিলেন। এছাড়া শতভাগ স্বাক্ষরতা কার্যক্রম,
গণশিক্ষা কর্মসূচি ।
নারী শিক্ষার উন্নয়ন,স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে তিনি শক্তিশালী করেন।দক্ষিণ এশিয়ায় তখন তার সমতূল্য নেতৃত্ব খুব কমই ছিলো তখন,ফলে তিনি সার্কের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন।
এর আগে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সংসদীয় কাঠামো থাকলেও,১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় দেশ শাসিত হয়েছে সামরিক ও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। জনগণের অবাধ ভোটাধিকার ও কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র তখন অনুপস্থিত ছিল। ফলে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা একটি ঐতিহাসিক অর্জন।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা, সংসদকে কার্যকর করা এবং বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিসর সম্প্রসারণ—এই পদক্ষেপগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুন করে ভিত্তি দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ক্ষমতা অর্জিত হয়েছিল গণআন্দোলন ও জনগণের রায়ের মাধ্যমে—কোনো সামরিক ফরমান বা ক্ষমতার উত্তরাধিকার হিসেবে নয়।
এই বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়াকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বলা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি ইতিহাসের একটি স্বীকৃত ও যুক্তিনিষ্ঠ পাঠ।নবধারার গণতন্ত্রের ইতিহাসে তাই তাঁর নাম কেবল একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়,বরং একটি নতুন গণতান্ত্রিক অধ্যায়ের সূচক হিসেবেই স্মরণীয় থাকবে।












