বাঙালি:একটি রুগ্ন জনগোষ্ঠি-হুমায়ুন আজাদ
বাঙালি চরিত্রের একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য ভন্ডামো!! বাঙালি প্রকাশ্যে একটি মুখোশ পরতে ভালোবাসে, মুখোশটি নানা রঙে রঙিন করে রাখে,কিন্তু তার ভেতরের মুখটি কালো, কুৎসিত।
বাইরে বাঙালি সব আদর্শের সমষ্টি, ভেতরে আদর্শহীন। বাঙালি সততার কথা নিরন্তর বলে, কিন্তু জীবনযাপন করে অসততায়।
বাঙলায় এমন কোনো পিতা পাওয়া যাবে না, যিনি পুত্রকে সৎ হতে বলেন না;,আর এমন পিতাও খুব কম পাওয়া যাবে, যিনি পুত্রের অসৎ উপার্জনে গৌরব বোধ করেন না । ‘চরিত্র’ সম্পর্কে বাঙালির ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ । ‘চরিত্রহীন’ বলতে বাঙালি বোঝে পরনারীতে আসক্ত পুরুষ! তার চোখে আর কেউ চরিত্রহীন নয়, শুধু পরনারীতে আসক্তই চরিত্রহীন বা দুশ্চরিত্র । ঘুষ খাওয়া চরিত্রহীনতা নয়, গৌরব! কপটতা চরিত্রহীনতা নয়, মিথ্যাচার চরিত্রহীনতা নয়, এমনকি খু*ন করাও চরিত্রহীনের লক্ষণ নয়, শুধু নারীআসক্তিই চরিত্রহীনতা । তবে বাঙালিমাত্রই পরনারীআসক্ত,প্রকাশ্যে নয়, গোপনে,।
বাঙালি প্রগতির কথা ব’লে প্রগতিবিরোধী কাজ করে প্রতিদিন, বাঙালী প্রকাশ্যে মহত্ব দেখিয়ে বাস্তব কাজের সময় পরিচয় দেয় ক্ষুদ্রতার । বাঙালি যা বিশ্বাস করে, মুখে তা প্রকাশ করে না!বাঙালি যা প্রকাশ করে, আচরণে তা পালন করে না!
বাঙালি পেছনে যার নিন্দা করে, মুখােমুখি তার তোষামোদ করে- যদি সে শক্তিমান হয় । শক্তি বাঙালির জীবনের বড়ো নিয়ন্ত্রক! বাঙালি শক্তিমানের পদানত হয় নির্দ্বিধায়, আর দুর্বলকে পীড়ন করে অবলীলায় । বাঙালি শক্তিমানের কোনো ত্রুটি দেখে না, শক্তিমানের সমস্ত অন্যায়কে মেনে নেয়, বাঙালির চোখে শক্তিমান কখনো চরিত্রহীন নয়, শক্তিমানের চরিত্র থাকার কোনো দরকার আছে ব’লেও মনে করে না বাঙালি; কিন্তু চরিত্রবান হওয়া দুর্বলের জন্যে বিধিবদ্ধ ।
বাঙালি খুবই পরনিন্দা করে, পিতার নিন্দা করতেও কুন্ঠিত হয় না! তবে বাঙালির চোখে সামাজিকভাবে কেউ নিন্দিত নয়, যদি সে শক্তিমান হয় । নিন্দিত শক্তিমানের কন্ঠে মালা পরাতে বাঙালি লজ্জিত হয় না, গর্ব বোধ করে, নিন্দিত শক্তিমানকে নিমন্ত্রণ ক’রে ধন্য বোধ করে বাঙালি । বাঙালি, অশেষ ভন্ডামোর সমষ্টি, শক্তিকেই মনে করে বিধাতা ।












