শেখ হাসিনাকে ফাঁসি দেয়া পরিকল্পিত
শেখ হাসিনাকে যে ফাঁসী দেয়া হবে সেটা অনেক আগেই পরিকল্পিত।উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র ক্ষমতাগ্রগণ যাতে তারা সিআইএ-আইএসআই ও মার্কিন সেনা পরিকল্পনা অনুসরণ করে বাংলাদেশ মার্কিন নিয়ন্ত্রিত প্রক্সি মিলিশিয়া রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশ ও ভারতের কাছে হেরে গেলে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ভুট্টো জানতেন যে প্রচলিত অস্ত্রের যুদ্ধে কোনভাবেই পাকিস্তান ভারতের সাথে জিতবে না। তিনি জেদ ধরে বসেন যে তিনি পাকিস্তানের জন্য পারমাণবিক বোমা বানাবেন।
ভুট্টো নিজে পারমাণবিক কর্মসূচিকে পাকিস্তানের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন, এমনকি এটাও বলেন যে, “আমরা ঘাস খেয়ে থাকব, কিন্তু বোমা তৈরি করব।”
তখন থেকেই পাকিস্তান তার পারমাণবিক কর্মসূচি বিকাশের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছিল, বিশেষ করে ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার (স্মাইলিং বুদ্ধা) প্রতিক্রিয়ায়। পাকিস্তান ১৯৭৩ সালে ফ্রান্সের সাথে একটি পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা প্লুটোনিয়াম পরিশোধনের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।
গোয়েন্দা সূত্রে এ খবর পশ্চিমা দেশগুলোর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। ইসরাইল মতামত দেয় যে, পাকিস্তান যে বোমা বানাচ্ছে সেটি হবে ইসলামী পারমাণবিক বোমা যার চূড়ান্ত টার্গেট হবে ইসরাইল। ইসরাইলের চাপে আমেরিকা ভুট্টোকে বোমা নির্মাণ কর্মসূচী থেকে সরে আসার জন্য বারবার চাপ দেয়।
১৯৭৭ সালের ১০ জুন, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে মার্কিন চাপ নিয়ে বিতর্কের সময় ভুট্টো প্রকাশ করেন যে, ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত সাহাবজাদা ইয়াকুব খানের সাথে বৈঠকে কিসিঞ্জার তাকে সতর্ক করেছিলেন।
ভুট্টোর বক্তব্য অনুসারে কিসিঞ্জার বলেছিলেন, যদি পাকিস্তান ফ্রান্সের সাথে প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্টের চুক্তি বাতিল না করে, তাহলে ১৯৭৬ সালের মার্কিন নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা সামনের গণতান্ত্রিক প্রশাসন পাকিস্তানকে “ভয়ঙ্কর উদাহরণ” হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরবে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যে দলই জিতুক, পাকিস্তানের জন্য “বহুবিধ সমস্যার” সৃষ্টি হবে।
ভুট্টো এই তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে বোমা তৈরির জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোরদার করার চেষ্টা করেন এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তান বিদেশি হুমকির কাছে মাথা নত করবে না এবং শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে তার পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাবে, যদিও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্টের কর্মকান্ডতে অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা ছিল স্পষ্ট।
জুলফিকার আলী ভুট্টোর কন্যা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো তার স্মৃতিকথা Daughter of Destiny (১৯৮৮) এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেন যে, তিনি তার পিতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং হেনরি কিসিঞ্জারের মধ্যে একটি উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সাক্ষী ছিলেন। এই ঘটনাটি ১৯৭৬ সালে লাহোরে কিসিঞ্জারের পাকিস্তান সফরের সময় ঘটেছিল।
বেনজিরের বর্ণনা অনুযায়ী কিসিঞ্জার ভুট্টোকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, পাকিস্তান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যায়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে “ভয়ঙ্কর উদাহরণ” হিসেবে তুলে ধরবে।
বেনজির উল্লেখ করেন যে, তার পিতা এই হুমকির জবাবে দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন যে পাকিস্তান তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অটল থাকবে এবং কোনো বিদেশি চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
এই বৈঠকের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ, এবং বেনজির এটিকে তার পিতার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন, যা পাকিস্তানের পারমাণবিক সংকল্পকে আরও জোরদার করেছিল।
মার্কিন চাপের মুখে ফ্রান্স ১৯৭৮ সালে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্টের চুক্তি থেকে সরে আসে। এটি পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল, যদিও পাকিস্তান ড. আবদুল কাদির খানের নেতৃত্বে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিকল্প পথে অগ্রসর হয়।
আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে ভুট্টো ১৯৭৭ সালের ৭ মার্চ আগাম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। ভুট্টোকে হটাতে বিরোধীরা পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (পিএনএ) নামের ৯–দলীয় জোট গঠন করে।
নির্বাচনে জয়লাভ করে পিপিপি। তবে এই নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তোলে পিএনএ। তারা ভুট্টোর নতুন সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে পুনর্নির্বাচন দাবি করে। ভুট্টোর পদত্যাগ চায় তারা।
নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের আন্দোলন সহিংস রূপ নিতে থাকে। বিরোধীরা প্রকাশ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ চায়। চাপে পড়ে ভুট্টো ছাড় দিতে রাজি হন। নতুন নির্বাচন নিয়ে পিএনএর সঙ্গে একটা সমঝোতাও হয়। এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া মার্কিন ডলার ও পাকিস্তানের আইএসআই এর প্রভাবেই হবার কথা।
এর মধ্যে ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করেন তাঁরই নিয়োগ করা সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া-উল-হক। এদিনই ভুট্টোকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে আটক করে রাখা হয়।
ক্ষমতা দখল করে জিয়া–উল–হক সামরিক আইন জারি করেন। স্থগিত করেন সংবিধান। তিনি জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেন। প্রায় এক মাস আটক রাখার পর জুলাইয়ের শেষ দিকে ভুট্টোকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ওই সময় পাকিস্তানের উপর যথেষ্ট ক্ষুব্ধ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভুট্টোর ভারত বিদ্বেষী জেদ ও পূর্ব পাকিস্তানকে হারানোর ক্ষেভে যে কোন প্রকারেই হোক পারমিণবিক অস্ত্র তৈরির শঙ্কা ইসরাইলকে তাড়িত করে এবং ভুট্টোকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেবার পরিকল্পনা হয়।
কিন্তু ঐ সময়ই নূর মুহাম্মদ তারাকির নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা ১৯৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করে। নবগঠিত আফগানিস্তান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (ডিআরএ) হয়ে যায় একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই পরিবর্তনের ফলে পাকিস্তানকে আবার প্রয়োজন হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। তখন সমাধান একটাই, ভুট্টোকে সরিয়ে দিয়ে জিয়াউল হককে সুপ্রিম কমান্ডার করে আফগানিস্তানে প্রক্সিযুদ্ধ শুরু করা।
ভুট্টোর বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালে নওয়াব মুহাম্মদ আহমেদ খান কাসুরির হত্যা মামলা নামে একটি পুরোনো ভুয়া মামলা কবর থেকে তুলে আনা হয়। যার পুনরায় তদন্ত করা হয়। ১৯৭৮ সালে তড়িঘড়ি করে লাহোর হাইকোর্ট ভুট্টোকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। বিচার প্রক্রিয়াটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল, কারণ এতে নিরপেক্ষতার অভাব, সাক্ষীদের উপর চাপ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ ছিল প্রকট।
১৯৭৯ সালে, ভুট্টোর ফাঁসির বছরেই, সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। এই ঘটনা শীতল যুদ্ধের ভূ-রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আনে এবং পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত মিত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
জিয়াউল হকের সামরিক শাসন তখন মার্কিন প্রক্সিতে পরিণত হয়। পাকিস্তান আফগান মুজাহিদিনদের সহায়তা প্রদানের জন্য একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
১৯৭৯ সালের আগে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা সীমিত করেছিল। কিন্তু সোভিয়েত হস্তক্ষেপের পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অর্থ, অস্ত্র এবং গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান শুরু করে ব্যপকভাবে যার বেশিরভাগ আসে সেনা কর্মকর্তাদের ও আইএসআই এর হাতে।
আফগানিস্তানে প্রক্সি যুদ্ধের সম্ভাবনা জিয়ার শাসনের বৈধতা এবং মার্কিন সমর্থন বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করে। ভুট্টোর ফাঁসি এই কৌশলগত পরিবর্তনের পথে একটি বড় বাধা দূর করে, কারণ তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তান সম্ভবত মার্কিন নীতির সাথে এতটা সহযোগিতামূলক হতো না।
বাইডেন প্রশাসনের এবং মার্কিন ডিপ স্টেটের ভারতে ত্রিমুখী নরম আক্রমণ পরিকল্পনা বহু আগে থেকেই। যার উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করে উত্তর পশ্চিমে ভারত এবং দক্ষিন পূর্বে মিয়নামারে অস্থিরতা তৈরি করে ভারত চীন উভয়কে ব্যস্ত রাখা। এর সাথে পরিকল্পনা ছিল ভারতের ভেতরে সন্ত্রাসবাদ উসকে দেয়া। এই সমীকরণে শেখ হাসিনা ভুট্টোর মতেই পথের কাঁটা। শেখ হাসিনাকে তাই ফাঁসি দেবার পরিকল্পনা অনেক উপরের।
কিন্তু সময়মত ভারত শেখ হাসিনাকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে সেই পরিকল্পনা। কিন্তু দেশে পাক মার্কিন চামার শ্রেণীর মির্জাফরেরা নিজেদের ইগো বাস্তাবায়নের জন্য হাওয়াই ফাসী দিয়ে উল্লাসে মেতেছে। তারা বুঝতে পারছে না যে তারা নিজেদের কবর খুঁড়েছে ঠিক জিয়াউল হকের মতই। আবার পারমাণবিক বোমা বানাতে উৎসাহী হলে বিমান দুর্ঘটনা ঘটিয়ে তাকে হত্যা করেছিল সিআইএ নিজেই।












