এএসপি আনিসুল ‘হত্যার’ বিচার মৃত্যুর আগে দেখতে পাবেন বাবা ফাইজুদ্দীন?
পাঁচ বছরেও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিম হত্যা মামলার বিচার শেষ না হওয়ায় হতাশ তার পরিবার। মৃত্যুর আগে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চান আনিসের বাবা। আর পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী বলছেন, বিচারের জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়ে যাবেন।
আনিসুল করিম মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর দুপুরে তাকে ঢাকার মাইন্ড এইড হাসপাতালে নেওয়া হয়। ভর্তির কিছুক্ষণ পর ওই হাসপাতালের কর্মচারীদের মারধরে আনিসুল করিমের মৃত্যু হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা ফাইজুদ্দীন আহম্মেদ বাদী হয়ে আদাবর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলাটি ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আফরোজা শিউলীর আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সবশেষ গত ৬ নভেম্বর সাক্ষ্যের জন্য কেউ আদালতে হাজির হননি। সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন আগামী ৮ মার্চ ঠিক করা হয়েছে।
আদালতের অতিরিক্ত পিপি রওশন আরা সুলতানা শাওন বলেন, মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে আছে; দুজনের সাক্ষ্য হয়েছে।
“সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে আদালত থেকে সমন পাঠানো হয়। কিন্তু তারা আদালতে আসছেন না। সাক্ষী আসলে মামলার বিচার শেষ হয়ে যাবে। আমরা মামলা শেষ করতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে প্রস্তুত রয়েছি।”
মামলা সম্পর্কে আনিসুল করিমের বাবা ফাইজুদ্দীন আহম্মেদ বলেন, “মামলার বিচার চলছে। আমরা চাই, মামলার বিচার দ্রুত শেষ হোক।
“কী ঘটছে, না ঘটছে সব তো হাসপাতালের সিসি ক্যামেরায় আছে। এটাই তো বড় প্রমাণ।”
তিনি বলেন, “মানুষ আসবে, যাবে; কেউ আগে, কেউ পরে। কিন্তু আমার ছেলেটাকে খুন করা হয়েছে, এর বিচার চাই। আমার বয়স ৮১ বছর। মৃত্যুর আগে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।
“নাতিটা (আনিসুল হকের ছেলে) তার বাবা সম্পর্কে জানতে চায়। বাবার অভাবটা সে ফিল করছে। বড় হচ্ছে তো। ছেলে হত্যার বিচার হোক। বিচারটা যেন দেখে যেতে পারি।”
আনিসুল করিমের স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, “এখন আর মামলা নিয়ে তেমন একটা প্রত্যাশা নেই, হতাশ হয়ে যাচ্ছি। গত বছরের ৫ অগাস্ট সরকার পরিবর্তনের পর মামলার হদিশ নেই। এর আগে বিচারটা এগোচ্ছিল, আশার আলো দেখছিলাম।
“কিন্তু ৫ অগাস্টের পর সবকিছু চেঞ্জ হয়ে গেছে। একা মানুষ, আবার মহিলা। দিশেহারা হয়ে যাচ্ছি। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে যাব।”
ছেলে সাফয়ানের কথা উল্লেখ করে শারমিন আক্তার বলেন, “ওর বাবা যখন মারা গেল, তখন ওর বয়স ছিল ৩ বছর প্লাস। এখন ৮ প্লাস বয়স। ডে বাই ডে অনেক কিছু ফেইস করতে হচ্ছে।
“বাবাকে নিয়ে সে এখন অনেক প্রশ্ন করে। অসহায় হয়ে পড়ছি। মামলা নিয়েও আশার আলো দেখছি না। অসহায় হয়ে গেছি।”
ছেলে সাফয়ানের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন শারমিন আক্তার।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, মধ্যযুগীয় কায়দায় এএসপি আনিসুল করিমকে আঘাত করা হয়েছিল। মাইন্ড এইড হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অপেশাদার লোকদের দিয়ে আনিসুলের দুই হাত পিঠ মোড়া দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর আসামিরা ঘাড়ে, বুকে, মাথায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
এ মামলায় ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ১৫ জনের বিচার শুরু হয়।
অন্য আসামিরা হলেন- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার আবদুল্লাহ আল মামুন, মাইন্ড এইড হাসপাতালের পরিচালক আরিফ মাহামুদ, ফার্মাসিস্ট তানভীর হাসান, কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন, সাজ্জাদ আমিন ও ফাতেমা খাতুন, হাসপাতালের সমন্বয়ক রেদোয়ান সাব্বির, হাসপাতালের কর্মচারী মাসুদ খান, জোবায়ের হোসেন, তানিফ মোল্লা, সজীব চৌধুরী, অসীম কুমার পাল, লিটন আহম্মেদ, সাইফুল ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল-আমিন।
আসামিদের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন পলাতক রয়েছেন। অপর ১৪ আসামি জামিনে আছেন।
২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। এখন পর্যন্ত মামলাটিতে আনিসুল করিমের বাবা ফাইজুদ্দীন আহম্মেদ ও ভাই রেজাউল করিম সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মামলা সম্পর্কে আসামিপক্ষের আইনজীবী জাহিদ ইকবাল বলেন, “মামলাটা ট্রায়ালে আছে। দুজন সাক্ষ্য দিয়েছে। তবে আইনসঙ্গতভাবে এ মামলা চলতে পারে না। কারণ আসামিরা ঘটনার সাথে জড়িত না। কারণ ভিকটিম ড্রাগ অ্যাডিক্টেড ছিল।
“তার বাবা সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলেছেন, আনিসুল করিম শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। সবার সাথে রূঢ় আচরণ করতো। বাবাকেও সে মারধর করেছে।”
মামলাটি তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ৮ মার্চ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার পরিদর্শক ফারুক মোল্লা।
মাইন্ড এইড হাসপাতালের চিকিৎসক নুসরাত ফারজানাকে এজাহারে আসামি না করলেও তিনি উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েছিলেন। পরে অভিযোগপত্রে তার নাম না আসায় বাদীপক্ষ আপত্তি তোলে।
এএসপি আনিসুলের পরিবারের ভাষ্য ছিল, ডা. নুসরাত ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত না হলে কেন তিনি আগেই জামিন নেবেন। এজন্য মামলাটি পুনরায় তদন্তের আবেদন করেন আনিসুলের বাবা ফাইজুদ্দীন আহম্মেদ।
পরে আদালত তা মঞ্জুর করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর নুসরাতকে বাদ দিয়ে ১৫ জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দাখিল করেন পিবিআইয়ের পরিদর্শক এ কে এম নাসির উল্যাহ।
মাইন্ড এইড হাসপাতালের পরিচালক মুহাম্মদ নিয়াজ মোর্শেদ মারা যাওয়ায় এবং ডা. নুসরাত ফারজানার বিরুদ্ধে অভিযোগের সতত্যা না পাওয়ায় তাদের মামলার দায় থেকে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরের বছর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত।
আসামি পক্ষের আইনজীবী জাহিদ ইকবাল বলেন, “এটা তৎকালীন সময়ের একটা ফরমায়েশি মামলা। ন্যায়ের দিক দিয়ে মামলা হলে তারা আসামি হন না। ভিকটিম আগে জাতীয় মানসিক হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সেখানে থেকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে পাঠানো হয়।
“সেদিন তাকে জাতীয় মানসিক হাসপাতাল থেকে হাত-পা বেঁধে আনা হয়। সেদিন একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন সাহেব আদাবর থানার ওসিকে চাপ দিয়ে মামলাটি করিয়েছেন। আসামিরা কোনো অপরাধ করেননি। আশা করছি, ন্যায়বিচারে তারা খালাস পাবেন।”












