নিজের দাদা ও পরিবারের জীবন বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ দিতে ৭০ বছর পর বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরে আসেন বিনিতা কেইন।
১৯৪৭ সাল,
ভারতভাগের আগ মুহূর্ত, ভারতের বিভিন্ন জায়গায় উগ্রবাদীরা একে অপরের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য নির্বিচারে হত্যা চালাতে শুরু করে রাজনীতি ধর্মের নামে। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। তৎকালীন নোয়াখালী হয় এর সবচাইতে ভয়াবহ শিকার।
নোয়াখালীর যামিনী মোহন সেইসময় বেশ ধনী একজন লোক ছিলেন।তবে সেই পরিস্থিতিতে তার জীবনের উপরও নেমে আসে ভয়াবহ শঙ্কা। ধরে ধরে সেই সময় নোয়াখালীতে হত্যা চালাতো উগ্রবাদীরা। জীবন বাচাতে তখন কলতাতা যাওয়া ছাড়া উপায় ছিলোনা তার। কিন্তু যাবে কীভাবে এইরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে? তখন সাহায্য করলেন তার কাছের বন্ধু মুজাফফর মীর। নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে যামিনী মোহন ও তার পরিবারকে নৌকায় করে নোয়াখালী পার করিয়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিয়ে আসলেন।
যামিনী মোহনের বাড়ি ছিলো তৎকালীন নোয়াখালি ও বর্তমান লক্ষীপুর জেলার মান্দারি গ্রামে।
সেই সময় নৌকা বাইছিলেন মুজাফফর মির, সাথে ছিলো তার ছোটো ছেলে যে গুন টানছিলো। পথে উগ্রবাদীরা তল্লাশির চেষ্টা করলেও যামিনা মোহনের পরিবারকে নিরাপদ স্থানে পৌছে দিয়ে আসেন মুজাফফর মীর।
চন্দননগরে গিয়ে ক্যাম্পে স্থান হয় যামিনী মোহনের। তার কাছে ৮০০০ রূপি ছিলো, যা ব্যাংকে রাখেন। তবে ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায় ও সেই লোক টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। একেবারে কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজা থেকে রাস্তার ফকির হয়ে যান যামিনী মোহন। পরিবারকে খাওয়ানোর জন্য তার কিছুই ছিলোনা। শোকে দুঃখে গরীব অবস্থাতেই তখন মারা যান। মৃত্যুর আগে ছেলেকে বলে যান ডাক্তার হতে। পরবর্তীতে তার ছেলে অনেক চেষ্টায় কলকাতা থেকে ডাক্তার হয় ও লন্ডনে সেটেল হয় তার পরিবার। যামিনী মোহনের নাতনি বিনিতা কেইন।
২০১৭ সালে দেশভাগের ৭০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ আসেন তার দাদা ও পরিবারের জীবনরক্ষা করার জন্য ধন্যবাদ দিতে। এটা নিয়ে বিবিসির একটা ডকুমেন্টারি হয়। পাঞ্জাবের দুই পরিবার ও বাংলার এক পরিবার নিয়ে মোট ৩ পরিবার নিয়ে হয় এই ডকুমেন্টারি।
বিনিতা কেইন যখন নোয়াখালীতে আসেন তার অনেক আগেই মুজাফফর মির মারা যান, তবে মুজাফফর মীরের ছোট ছেলে যে ওইসময় নৌকার গুন টানছিলো সে বেচেছিলেন ও তার ছেলে আব্দুল জহিরও ছিলেন। তাদের সাথে দেখা করে ধন্যবাদ জানান বিনিতা কেইন। এতবছর পর তাদের খুজে পাওয়াটাও বড় ব্যাপার। যাইহোক তাদের এই কাহিনী মনকে ছুয়ে গেলো।
২ সপ্তাহ পর সেই ভারত ভাগের ৭৩ বছর পূরন হবে। যারা সেই সময় বেচেছিলেন ও ঘটনা মনে আছে তাদের অনেকেই মারা গিয়েছেন ও অনেকের বয়স হয়ে যাচ্ছে। তাদের মুখে সেই সময়ের বাস্তব ইতিহাস সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি। সেই কাজটিই করছে ফেসবুক পেইজ ১৯৪৭ partition archive। তারা মারা যাওয়ার আগেই ইতিমধ্যে ৯০০০ স্মৃতিচারণ তারা রেকর্ড করেছে আরো করে চলছে। তাদের পেইজে সব আছে।
সেখান থেকে বাছাইকৃত বাংলাদেশের সাথে জড়িত কিছু গল্প আগামী কয়েকদিনে শেয়ার করবো দেশভাগের ৭৩ বছর উপলক্ষে।
এইরকম সফল বন্ধুত্বের গল্প দেখলে অবশ্যই আনন্দ লাগে, তবে দিনশেষে সেই প্রশ্ন উঠেই যায় কেনো তাকে ও পাঞ্জাব, বাংলায় অন্য রিফিউজিদের তাদের নিজের বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়েছিলো? এর উত্তর নেই।
যারা এইসব হত্যাকাণ্ড ও মানুষের নির্মম দুর্ভোগের জন্য দায়ী সেইসব গুটিকয়েক লোক এখনো উপমহাদেশের সমাজে বেচে আছেন, বলতে পারেন তাদের উত্তরসূরীরা। সুযোগ পেলেই এরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করে। এদের অঙ্কুরে বিনাশ করতে হবে।
বিনিতা কেইন এর ভিডিও লিংক কমেন্টে দেয়া।
ছবিতে : যামিনী মোহনের পুরনো ছবি,বিনিতা কেইন, মুজাফফর মীরের ছেলে ও নাতি বাংলাদেশে তাদের এলাকার চায়ের দোকানে যখন বিনিতা দেখা করতে আসেন।
নির্বাহী সম্পাদক-জাফর মাতুব্বর, সহ-সম্পাদক-মোঃআমিনুল ইসলাম
Mobile: +8801611-118649, +8801622-356873,
E-mail: newsajsaradin@gmail.com,ajsaradin24@gmail.com
©নকশী হ্যান্ডিক্রাফট বিডি লিমিটেড এর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। ১০৯,গ্রীণ রোড,ফার্মগেইট, ঢাকা-১২০৫ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।