লোকটার প্রায় কিছুই সংরক্ষণ করা যায়নি।
লোকটার জীবনটাই তো উদ্বাস্তুর।
নিজের ঘরেও সবসময় বহিরাগত।পাসপোর্টহীন।
'মাল্যবান'-এ দেখি স্ত্রী উৎপলা মাল্যবানকে ফুটপাতে গিয়ে শুতে বলছে।মাল্যবান অবাক চোখে তাকিয়ে বললে, কখন যাব!
উৎপলা বললে,এখনই যাও।
ফুটপাতে গিয়ে না শুলেও শেষ অবধি মেসে চলে যায় মাল্যবান।
৫৫ বছরের জীবনে জীবনানন্দ দাশের নিজস্ব একটা বাড়ি কোনওদিনই হয়নি।
এম.এ.পড়তে কলকাতা যাওয়ার আগে একটানা ১৮ বছর আর ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৬ এই ১১ বছর তিনি বরিশালের পৈতৃক ভিটা 'সর্বানন্দ ভবন'-এ সামান্য কিছুদিন থিতু হয়েছিলেন।বাকি জীবনটা তো সত্যিই পরগাছার।
ছাত্রজীবন ও সিটি কলেজের টিউটর জীবনে তো ৬/৭ বার বাড়ি বদল করেছেন।কিছুদিন ছিলেন বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের একটা ভাড়া বাড়িতে।
দিল্লি,বাগেরহাট,খড়গপুর কোথায় না ডেরা পেতেছেন!বোর্ডিঙের দুঃসহ দোদুল্যমান ৫/৬ বছরের জীবন! ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৪,এই ৯ বছরের জীবন তো নরকযন্ত্রণার।
নরকযন্ত্রণাই যে তার সাক্ষী কবির শেষজীবনের বিভিন্ন স্মৃতিচারণায়।
হয়তো মৃত্যুই হত না তাঁর যদি বোন সুচরিতাকে সঙ্গে নিয়ে বেহালার দিকে যে জমি দেখতে যেতেন,এবং সত্যিই সেখানে জমি যদি পেয়ে যেতেন।
এতদূর অবধি অনিশ্চিত জীবন যে একটি চিঠিতে লিখছেন,পরবর্তী চিঠি আমাকে আর এই ঠিকানায় পাঠাবেন না।
তো চালচুলোহীন এই লোকটার কী আর সংরক্ষণ হবে!নিজস্ব থাকার বলতে তো কালো কয়েকটা ট্রাঙ্ক,যা তিনি বুকে আগলে রাখতেন।
তাও তো মৃত্যুর পর সব লুটপাট হয়ে গেল।
কিছু খাতা হারিয়ে গেল,কিছু খাতা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে গেল।জিনিসপত্র যে কোথায় গেল!
হাতে থাকল পেনসিল।
একটা কলম,একটা ব্যবহৃত বই,একটা শার্ট,একটা চুরুট,একটা আধপোড়া সিগারেট কোথাও সংরক্ষণ হল না।
যে দু'টো বাড়িতে জীবনানন্দ জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন,একটি বরিশাল ও একটি কলকাতা,তার একটি তো ১৯৬৪-র ঝড়ে ভেঙে পড়েছে, আরেকটিতে বাড়ির মালিকানার পরিবর্তন হওয়ার পর বর্তমান মালিক সবাইকে কুকুরবেড়ালের মতো তাড়িয়ে দেয়।
পাঠকের ইচ্ছে হবে না,'মাল্যবান' ঠিক কোন ল্যাটিচুড লঙ্গিচিউডে বসে লেখা!
ইচ্ছে হবে না,ড্যাব ড্যাব করে কোথায় বসে তিনি সাবলেট করা মহিলার বাড়িতে বেড়াতে আসা মেয়েদের দেখতেন!(সাবলেট করা মহিলা একটি সাক্ষাৎকারে একথা জানিয়েছেন)
মাল্যবান ও উৎপলার খাটের দূরত্ব ঠিক কতটুকু ছিল!কোথায় অপরেশ সাইকেলটা রাখত।
না কোনও ইউনিভার্সিটি, না কোনও সরকার,না কোনও প্রতিষ্ঠান কেউ লোকটার পাশে নেই।
কোনও লবি নেই।গোষ্ঠী নেই।দাদা নেই।
তিনি জানতেন 'প্রফেসর' আসলে 'ফুঃ'!
লোকটা একা।
বড্ড একা।
আজও একা।
গায়ে একটা চাদর নেই।পায়ে কোনও মোজা নেই।পরকালে তো বিশ্বাস ছিল না লোকটার।একটু তিল ও কুশও কোথাও দেওয়া নেই।
একটা পোক্ত চেয়ারের কথা লিখেছিলেন।ডায়েরিতে লিখেছিলেন, লেখার জন্য একটা পোক্ত চেয়ার চাই।চামড়া সিগারে পোড়ালে তবে সেই চেয়ারে বসে লেখা হবে।
একটি চেয়ারের সন্ধান পাওয়া গেছে।জীবনানন্দর ব্যবহৃত কিছু বইয়ের।এই চেয়ারটাতে বসেই জীবনানন্দ দাশ বরিশাল পর্বে অনেক গল্প উপন্যাস কবিতা লিখেছেন। বিশেষত কবিতা।বনলতা সেন,ধূসর পাণ্ডুলিপি ও মহাপৃথিবী পর্বের অনেক কবিতাই আমার বিশ্বাস এই চেয়ারটিতে বসে লেখা।
আমরা হতভাগ্য একটা জাতি।
মুঠোয় কিছুই ধরে রাখতে পারি না।
বালি তো অনেক দূর একটি কলমও নয়!'আর্কাইভ' জ্ঞান আমাদের শূন্য।ক্লিন্টন সিলি সুদূর আমেরিকা থেকে এসে গবেষণা করে ফিরে গেলেন সেই ষাটের দশকে আর আমাদের ঘুম ভাঙলো এসে শতবর্ষে।
আবার হয়তো ১৫০ বছরে ঘুম ভাঙবে।
সাহিত্য অকাদেমি নড়েচড়ে বসবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গ্রান্টের জন্য সুপারিশ করবে।
একটা নির্জন চেয়ার আরও নির্জন হতে থাকবে।
শুধু একটা পোকা গুটিসুটি।
শ্লথ ও বিষণ্ণ।
তবু এগিয়ে যাবে।
গ্রন্থনা-
গৌতম মিত্র
জীবনানন্দ গবেষক
নির্বাহী সম্পাদক-জাফর মাতুব্বর, সহ-সম্পাদক-মোঃআমিনুল ইসলাম
Mobile: +8801611-118649, +8801622-356873,
E-mail: newsajsaradin@gmail.com,ajsaradin24@gmail.com
©নকশী হ্যান্ডিক্রাফট বিডি লিমিটেড এর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। ১০৯,গ্রীণ রোড,ফার্মগেইট, ঢাকা-১২০৫ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।