আমাদের রাষ্ট্র কেবল বিচারিক রোবট না হয়ে একটু মানবিক হয়ে উঠুক
সাহিত্য ক্যাটাগরিতে সেবার স্বাধীনতা পুরষ্কারের জন্য নাম ঘোষনা করা হয়েছিলো এস এম রইজ উদ্দিন আহম্মদ নামে একজন সাবেক সরকারী কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক সাহিত্যিকের। এই ঘোষনার পরপরই নাগরিক সাহিত্য-সেবকরা হইচই শুরু করলেন, এই রইজ উদ্দিনকে তারা চেনেন না।
খোদ বাংলা অ্যাকাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান লিখেছিলেন, ‘ইনি কে? চিনি না তো।’
এই নিয়ে ব্যাপক ট্রল শুরু হলো। এসব সামাল দিতে না পেরে কয়েক দিনের মধ্যে রইজ উদ্দিনের নাম বাদ দিয়ে আবার স্বাধীনতা পুরষ্কারপ্রাপ্তদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হলো।
এই অবধি গল্প আপনারা জানেন।
জানেন না যে, এই রইজ উদ্দিন ওই পুরষ্কার বাতিলের পর কী ভয়ানক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছেন।
রইজ উদ্দিন হয়তো নাগরিক বিবেচনায় সাহিত্যিক পদবাচ্য নন। কিন্তু তার একটা সাহিত্যজগত আছে। তিনি লম্বা জীবন ধরে দক্ষিন বঙ্গে বসে লেখালিখি করেছেন, সংগঠন করেছেন। একটা জাতীয় সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। এই সংগঠনের সুবাদে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের এমন শখের সাহিত্যিকদের সাথে তার বিপুল সখ্যতা ছিলো।
স্বাধীনতা পুরষ্কারের তালিকায় তার নাম থেকে শত শত মানুষ রইজ উদ্দিনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সেই মানুষগুলোকে এই বৃদ্ধ কীভাবে মুখ দেখিয়েছিলেন, সেটা ভাবতে পারেন? লোকে তার কাছে জানতে চাইতো, রইজ ভাই, আপনার পুরষ্কার কেড়ে নিলো কেনো? কী অন্যায় করেছেন আপনি?
হ্যা, এই রইজ উদ্দিনদের অন্যায়টা কী? কিংবা এবার যারা বাংলা অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পেয়েও বাতিলাদেশ পেলেন, তাদের অপরাধ কী?
রইজ উদ্দিন নিজে আবেদন করেছিলেন পুরষ্কারের জন্য; সেটাই নিয়ম। সেই আবেদন যাচাই বাছাই না করে সে সময়ের ভূমিমন্ত্রীর সুপারিশে তাকে পুরষ্কার তালিকায় যুক্ত করা হয়েছিলো।
এবার ড. হান্নান বা রেজাউর রহমান স্যার বা অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান এরকম আবেদন তো করেননি বাংলা অ্যাকাডেমি পুরষ্কারের জন্য। তাহলে তাদের কেনো এই ‘অপরাধী’ বানানো হলো? কেনো এই লোকগুলোকে এমন অবমাননা করা হলো?
আমাদের সংষ্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ভাইয়ের কয়েকটা স্ট্যাটাসে পরিষ্কার, তিনি এই পুরষ্কার স্থগিত করার প্রক্রিয়াটা জানেন।
ফারুকী ভাই, আপনি তো দারুন মানবিক একজন মানুষ। একটি ছেলে কখনো আপনার কোনো কাজে লাগবে না জেনেও আপনি তাকে সহায়তা করেন মানবিক কারণে। বেকার হয়ে যাওয়া মানুষের জন্য আপনি বেকারকে না চিনেই তার জন্য কিছু করার চেষ্টা করেন।
আজ, আপনার সম্মতিতে এমন অবমাননা হলো?
কাল যখন নতুন তালিকা প্রকাশ হবে, সেখানে আগের তালিকার যাদের নাম থাকবে না, তারা কী অবমাননার মধ্যে দিয়ে যাবেন, একবার কল্পনা করেন প্লিজ। এবার তালিকায় যাদের নাম ছিলো, তারা কেউ রইজ উদ্দিন নন। এরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, গুনীজন। একদা বঙ্গবন্ধু নিয়ে গবেষনা করেছেন বা কারো ভাই দেশের শীর্ষ সম্পাদক; এই অপরাধে এমন অপমান তাদের প্রাপ্য ছিলো না। তাও দাওয়াত দিয়ে নিয়ে অপমান!
ভাই, যা হয়েছে, তো হয়েছেই। এখন অনুরোধ করি, এবারের মতো বাংলা অ্যাকাডেমি পুরষ্কারটা একেবারেই স্থগিত করে দেন। তাতে অন্তত বাদ পড়ে কারো আর আলাদা করে চিহ্নিত হতে হবে না। এইটুকু দয়া অন্তত দেখান।
আমাদের রাষ্ট্র কেবল বিচারিক রোবট না হয়ে একটু মানবিক হয়ে উঠুক।
লেখক-দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
কথা সাহিত্যিক,সামাজিক ব্যক্তিত্ব












