ভিক্ষাবৃত্তি…..!
।।আশফাুকুর রহমান মিলন।।
পুরাতন শাড়ি পরিহিত এক অর্ধবয়সী মহিলা ভিক্ষুক শহিদুল সাহেবের কাছে কিছু সাহায্য চাহিল। শহিদুল সাহেব দশ টাকা ভিক্ষা প্রদানের জন্য উদ্যত হইলে তাঁহার বন্ধুসম কেরামত সাহেব ভিক্ষা প্রদানে বাধা প্রদান করিলেন এবং অভিযোগ করিলেন –
“এই ভিক্ষুকের ভিক্ষা করার প্রয়োজন নেই। সেদিন দেখলাম তার মেয়ে মূল্যবান পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের অবস্থা এখন ভাল। তাও ভিক্ষা করে কিন্তু কাজ করে না।“
শুনিয়া শহিদুল সাহেবও বুঝিলেন ও বলিলেন,
“ ইদানিং এই ধরনের ভিক্ষুক বেশী হয়ে গিয়েছে। প্রকৃত ভিক্ষুক চেনা দায়।“
তারপরও কি মনে করিয়া তিনি দশটি টাকা সাহায্য করিলেন।
শহিদুল সাহেব একজন ঠিকাদার এবং কেরামত সাহেব সরকারী গুরুত্বপূর্ণ অফিসের উচ্চমান সহকারী যাহাকে অফিসের সবাই বড়বাবু বলিয়া সম্বোধন করেন।
বড়বাবু অফিসের কার্য যত্ন করিয়া সম্পাদন করিয়া থাকেন। মনুষ্যজাতি তাহাদের কাঁধে কার্য চাপাইয়া দিলে অখুশি হইলেও বড়বাবু ঠিক তাহার বিপরীত। কার্য না থাকিলে তিনি বড্ড অখুশি হন। তাঁহার খুশির মাত্রা টেবিলের উপর রক্ষিত অসস্পন্ন নথির সংখ্যার সমানুপাতিক। আরও মজার বিষয় হইল নথি অনুমোদনের জন্য আবশ্যকীয় কোন কাগজের ঘাটতি থাকিলে বা কোন শর্ত পরিপালন না হইলে বড় বাবু কখনও রাগান্বিত হন না বরং খুশি হন। কারন বড়বাবুর মন অনেক বড়! তাহার ধৈর্য দেখিয়া সবাই প্রথম দিকে অবাক হইলেও এখন আর কেহ অবাক হন না কারন এতদিনে অনুসন্ধানে খুশির কারন উদঘাটিত হইয়া গিয়াছে।
যে কোন আইনি জটিলতা নিরসনে সিদ্দ্বহস্ত বড়বাবু নথি অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করিতে যাইয়া নথিতে সমস্যা খুঁজিয়া বেড়ান। সমস্যা না পাইলে তাহার মন খারাপ হয়। সমস্যাযুক্ত নথি আলাদা করিয়া রাখেন। অসস্পন্ন নথি বারে বারে গণনা করেন আর হিসাব করিতে থাকেন।
নথি কত দ্রুত প্রস্তুত করিতে হইবে, নথিতে কোন কাগজের ঘাটতি ও তার প্রয়োজনীয়িতা কতটুকু, অনুমোদনের জন্য কতটুকু শর্ত পরিপালনে ঘাটতি রহিয়াছে ইত্যাদি নিয়ামক গুলি নথির দর নির্ধারণ করিতে বিবেচিত হইয়া থাকে। দ্রুতযান ট্রেনের ভাড়া যেমন বেশী দ্রুত নিস্পন্ন করিতে দরও বেশী। প্রতিটি শর্তভঙ্গের জন্য নথিতে মূল্য সংযোজিত হয়।
সকল শর্ত পুরণ করিয়া নথি দাখিল করিতে থাকিলে তাহাদের উপার্জনে ঘাটতি হইবে এই বিবেচনায় প্রতি বৎসর নতুন নতুন শর্ত সংযোজিত হয়। শর্ত যত বেশী তা পরিপালন করিতে ব্যর্থ হইবার সম্ভবনাও ততো বেশী। তাহাতে নথির দর তর তর করিয়া বাড়িয়া যায়। সেবা প্রত্যাশিদের পকেট ফাঁকা হইতে থাকে আর তখন বড় বাবুর পকেট ভারী হয়। অফিসের মধ্যে বড়বাবুর থেকে পদবীতে যারা ভারী তাঁহাদের পকেট আরও ভারী হয়। এইভাবে দিনে দিনে বড়বাবুর সহিত তাঁহার উচ্চপদস্থ কিংবা নিম্নপদস্থ একইসাথে আনুপাতিক হারে অর্থে সম্পদে বড় হইতে থাকে।
বড়বাবুর বড় গুন হইল, ভিক্ষুকের মতই, টাকা চাহিতে তাঁহার কোন প্রকার লজ্জা করে না এবং তিনি ভদ্রলোকের মতই একদরেই লেনদেন করিয়া থাকেন। তাছাড়া বড়বাবু ভাল করেই জানে দোকান তো একটাই। তাই একচাটিয়া বাজার ব্যবস্থার মতই ইচ্ছেমতো দর নির্ধারণ করিয়া লয়।
বড়বাবুর বড় আক্ষেপ হইল -এত কস্ট করিয়া কার্য সম্পাদন করিয়াও তিনি কাহারও মন পাইলেন না।
ভিক্ষুকের সন্তানেরা ভাল পোষাক পরিধান করিলে, তাহারা সুস্থ্য থাকিলে কিংবা বয়স কম হইলে সাহায্য চাহিবার সময় খোটা শুনিতে হয়। কিন্ত মাসিক পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা মাইনে পাওয়া বড়বাবুর সন্তানরা নিজস্ব গাড়ীতে স্কুলে গমন করিলেও, পাঁচতলা ভবনের মালিক হইলেও তাহাকে কেহ মুখ ফুঁটিয়া বলিবে না, ” অনেক টাকার মালিক হয়েছেন! আর কতো?,”
যে কোন কাজে প্রয়োজন হইতে পারে এই ভয়ে সকলে তাহাকে মানিয়া লয়। আর বড়বাবু নিশ্চিন্তায়, নির্ভাবনায়, সহকর্মীদের সাথে লইয়া বহাল তবিয়তে তাহার কার্য সম্পাদন করিয়া যায়।
তবুও মাঝে মাঝে কিছু কথা শুনিতে হয় বৈ কী। বাড়তি টাকা পরিশোধ করিতে যাইয়া কেহ কেহ যখন মনক্ষুন্ন হন। তখন তাঁহারা রাগাহ্নিত হইয়া বড়বাবুকে বলেন,
“আপনাদের কি কোন বিবেক নেই?”
বড়বাবু মুচকি হাসিয়া দেন। আর মনে মনে কহেন,
“বিবেক! সে তো কবেই মারা গিয়েছে! এখন আর দংশন করতে পারে না।“
অফিস শেষ করিয়া বড়বাবু কেরামত সাহেব বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে এক ভিক্ষুক আসিয়া সাহায্য চাইল। বড়বাবু দক্ষিন-হস্ত দ্বারা তাঁহার পকেট চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন,
“ এখন হবে না। ভিক্ষা করো ক্যান? সুস্থ মানুষ! কাজ করে খেতে পারো না?”

আশফাকুর রহমান মিলন
লেখক-কলাম লেখক,ব্যাংকার,সামাজিক ব্যক্তিত্ব












