হেলাল উদ্দিন পারভেজ
সযত্নে তোলা ফ্যামিলি অ্যালবামের পাতা ওল্টাচ্ছেন? বাবা-মায়ের সাথে হাসিমুখের ছবিটা দেখে ভাবছেন, "আমি কত ভালো সন্তান"? এই সেলফির আড়ালের সত্যটা শোনার জন্য প্রস্তুত তো? কারণ আধুনিক ফ্ল্যাটের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে এক ভয়ংকর নীরবতা, যা বৃদ্ধাশ্রমের একাকীত্বকেও হার মানায়। এটা কোনো গল্প নয়, এটা আপনার বা আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়া এক শীতল বাস্তবতা।
শুরুটা হয় খুব সূক্ষ্মভাবে। বাবা রিটায়ার করার পর তার পেনশন বা ফিক্সড ডিপোজিটের টাকার হিসাবটা ছেলে বা মেয়ের হাতে চলে আসে। মুখে বলা হয়, "বাবা, তুমি আর কত চিন্তা করবে? এবার আরাম করো।" আসলে এটা আরাম নয়, এটা হলো আর্থিক পরাধীনতার প্রথম ধাপ। যে মানুষটা একদিন পুরো সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন, তাকে আজ নিজের টাকার জন্য সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এটা হলো সেই বিষ, যা ধীরে ধীরে আত্মসম্মানকে মেরে ফেলে।
এরপর শুরু হয় মানসিক অত্যাচার। একসাথে খেতে বসলে বাবা হয়তো একটু শব্দ করে খান, কিংবা মা হয়তো পুরনো দিনের গল্প বলতে শুরু করেন। আর সাথে সাথেই ভেসে আসে বিরক্তির দীর্ঘশ্বাস বা চোখের ইশারা। "আঃ, মা! রোজ রোজ এক কথা শুনতে ভালো লাগে?"—এই একটা বাক্যই যথেষ্ট একজন মানুষকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে দেওয়ার জন্য। তিনি বোঝেন, এই সংসারে তার কথার আর কোনো দাম নেই। তিনি এখন আসবাবপত্রের মতোই একটা পুরনো জিনিস, যাকে ফেলে দেওয়া যায় না, কিন্তু যার উপস্থিতিটাও অসহ্য।
সবচেয়ে ভয়ংকর খেলাটা শুরু হয় সম্পত্তি নিয়ে। কিছু "শিক্ষিত" এবং "প্রতিষ্ঠিত" সন্তান তাদের বাবা-মাকে আবেগের ফাঁদে ফেলে। "এই ফ্ল্যাটটা তো একদিন আমাদেরই হবে, তার চেয়ে আগেই আমাদের নামে লিখে দাও। লোনের সুবিধা হবে।" সরল বিশ্বাসে বাবা-মা তাদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু সন্তানের হাতে তুলে দেন। আর ঠিক সেদিন থেকেই তারা হয়ে যান নিজ বাড়িতে থাকা এক অসহায় ভাড়াটে। তাদের ঘরটা বদলে দেওয়া হয়, সবচেয়ে ছোট বা অন্ধকার ঘরটা তাদের জন্য বরাদ্দ হয়। তাদের বলা হয়, "অতিথি আসবে, তোমরা ওই ঘরে থাকো।" এই "অতিথি" নামক অদৃশ্য ছায়াটা আর কোনোদিন তাদের জীবন থেকে সরে না।
আপনার কি মনে হয় না, এই সন্তানরা এক ধরনের মানসিক কসাই? যারা ছুরি দিয়ে নয়, অবহেলা আর অপমান দিয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে তাদের বাবা-মাকে হত্যা করে? বৃদ্ধাশ্রমে তো তবু সমবয়সী চারজন মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ থাকে। কিন্তু নিজের ফ্ল্যাটে, নিজের সন্তানের সংসারে বাবা-মায়েদের কথা বলার সঙ্গী থাকে শুধু চার দেওয়াল আর ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকা বোবা দৃষ্টি। তাদের কান্নাটাও শব্দহীন, কারণ জোরে কাঁদলে যদি ছেলে-বউমার ঘুমের অসুবিধা হয়!
সমাজও এই ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় দেয়। ফেসবুকে "মাদার্স ডে" বা "ফাদার্স ডে"-তে বাবা-মায়ের সাথে ছবি দিয়ে লম্বা ক্যাপশন লেখা ছেলেটাকেই সবাই "সুপুত্র" বলে বাহবা দেয়। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করে না, ছবির বাইরে এই বাবা-মায়ের জীবনটা কেমন? আত্মীয়-স্বজন সব দেখেও চুপ করে থাকে, কারণ "পারিবারিক বিষয়"-এ নাক গলানোটা নাকি অভদ্রতা। এই ভদ্রতার মুখোশের আড়ালেই প্রতিদিন খুন হন হাজারো বাবা-মায়ের স্বপ্ন আর শেষ জীবনের শান্তি।
এবার কিছু সরাসরি প্রশ্ন, যা আপনার বিবেকের দরজায় আঘাত করবেই:
আপনার কি মনে হয় না, বাবা-মায়ের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাদের বোঝা মনে করাটা ঠান্ডা মাথায় করা একটা অপরাধ, যা ডাকাতির থেকেও ভয়ংকর?
যে সন্তান তার জন্মদাতার চোখের জলকে অবহেলা করে নিজের সুখ খোঁজে, সে কি মানুষ না কি একটা স্বার্থপর শকুন, যে জীবন্ত শরীরের মাংস খুবলে খেতে ভালোবাসে?
আপনি কি আপনার চারপাশে এমন কোনো পরিবারকে চেনেন, যেখানে বাবা-মা থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য? তাদের দীর্ঘশ্বাস কি কখনো আপনার কান পর্যন্ত পৌঁছায়?
সবশেষে একটাই শীতল প্রশ্ন আপনার দিকে ছুঁড়ে দিলাম— আজ আপনি আপনার বাবা-মায়ের সাথে যা করছেন, কাল আপনার সন্তান সেই আয়নাটা আপনার সামনেই ধরবে না তো? ভেবে দেখুন, আপনার জন্য কোন ফ্ল্যাটটা তৈরি হচ্ছে—আপনার স্বপ্নের ফ্ল্যাট, নাকি আপনার সন্তানের কাছে আপনি যখন ‘অসুবিধা’ হয়ে যাবেন, তখন আপনাকে রাখার গোডাউন?
লেখক-কলামিস্ট,নির্মাতা
নির্বাহী সম্পাদক-জাফর মাতুব্বর, সহ-সম্পাদক-মোঃআমিনুল ইসলাম
Mobile: +8801611-118649, +8801622-356873,
E-mail: newsajsaradin@gmail.com,ajsaradin24@gmail.com
©নকশী হ্যান্ডিক্রাফট বিডি লিমিটেড এর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। ১০৯,গ্রীণ রোড,ফার্মগেইট, ঢাকা-১২০৫ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।