বিপ্লবে অংশ নিয়ে নিহত বিপ্লবের পরিবারে হাহাকার!
।।আজ সারাদিন ডেস্ক।।
‘বাড়তি আয় করতে ঢাকা গিয়ে ছেলেটার প্রাণটাই গেল’
এক বছর পেরিয়ে গেছে, জুলাই আন্দোলনের শহীদ বিপ্লব মণ্ডলের পরিবার সামলে ওঠার উপায় দেখছে না।
মণ্ডলের মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে এক বছর। তাকে হারিয়ে অসহায় পরিবারটি এখনো সামলে ওঠার উপায় দেখছে না।
বিপ্লবের বাবা লুৎফর মণ্ডল নিজেদের আর্থিক দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, “একটু বাড়তি আয়ের আশায় ঢাকা গেল। বাড়তি আয় করতে গিয়ে ছেলেটার প্রাণটাই গেল। গ্রামে থাকলে হয়ত ছেলেটাকে হারাতে হত না।”
বিপ্লব মণ্ডল
নওগাঁর সান্তাহার উপজেলার শিমুলিয়ার বাসিন্দা । ৩৩ বছর বয়সী এই যুবক সেখানেই একটি সেলুনে কাজ করতেন আগে। যা আয় করতেন, তা দিয়ে মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোনদের নিয়ে সংসার চলত না।
একটু বাড়তি আয়ের আশায় তিন বছর আগে বিপ্লব পাড়ি জমান ঢাকায়। আশুলিয়ার সোনিয়া মার্কেটের নালিজার মোড়ে ফারুকের সেলুনের দোকানে কাজ নেন।
তার স্ত্রী আরিফা বেগম একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ৯ বছরের একমাত্র মেয়ে আমেনাকে নিয়ে তারা ভাড়া বাসায় থাকতেন।
বিপ্লবের বড় বোন মোসাম্মৎ মেমীও পাশেই আরেক ভাড়া থাকতেন, তিনিও পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।
গতবছর জুলাই মাসে সারাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। অনেক তরুণ-যুবার মত বিপ্লবও সেই আন্দোলনে যোগ দেন।
আওয়ামী লীগের সরকার পতনের দিন, অর্থাৎ ৫ অগাস্ট সাভারের বাইপাইল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বিপ্লব। পরে তার স্ত্রী-সন্তান গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
যোগাযোগ করা হলে বিপ্লবের বাবা লুৎফর মণ্ডল বলেন, “ছেলের ওপর ভরসা করেই থাকতাম। ছেলেটা মারা গেছে। এখন অনেক কষ্টে আছি। বয়স হয়েছে, নিজেও তেমন কিছু করতে পারি না। একদিন মাঠে গেলে দুইদিন বিছানায় থাকতে হয়। ওর মা সবসময় ছেলের কথা মনে করে কান্নাকাটি করে।”
তিনি বলেন, “আমরা গরীব মানুষ। ছেলের হত্যার বিচার চাই।”
বিপ্লব নিহত হওয়ার ২৫ দিন পর ৩১ অগাস্ট বড় বোন মোসাম্মৎ মেমী আশুলিয়া থানায় মামলা করেন।
ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ৩৬ জনকে মামলায় আসামি করা হয়। থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) ।
তদন্ত শেষে গত ২৭ অগাস্ট ৪৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছেন পিবিআইয়ের এসআই মো. ইমরান আহমেদ।
গত ১১ সেপ্টেম্বর মামলার দিন ধার্য ছিল। ওইদিন অভিযোগপত্রটি দেখেছেন ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম তাজুল ইসলাম সোহাগ। অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য তিনি আগামী ২১ অক্টোবর দিন রেখেছেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই বিশ্বজিৎ দেবনাথ জানিয়েছেন।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- সাইফুল ইসলাম, শামীম আহম্মেদ সুমন ভূঁইয়া, তার ছেলে কাব্য, আবুল হোসেন আপন, গিয়াস উদ্দিন মোল্লা, শাহি মোল্লা, মোখলেছুর রহমান, ফজল হক মীর, এনামুল হক, মাছুম খান, মোজাম্মেল হক মোজাম, মামুন খান, সোহেল মীর, আলামিন মণ্ডল, খলিল মণ্ডল, রিপন, সোহেল মিয়া, মোর্শেদ আলম ভূঁইয়া, মহিদুর রহমান ওরফে মাহি, আরিফ, বাবু, হেলাল উদ্দিন, মনোয়ার হোসেন রাজু, ইসতিয়াজ উদ্দিন, ইমরান মোল্লা, সোহেল তালুকদার, আবু তাহের মৃধা, সাইদুর রহমান সম্রাট, জিল্লুর রহমান ওরফে রনি মোল্লা, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ওরফে মুকুল, জামান মীর, হযরত আলী, লুৎফর, আওলাদ হোসেন, সাহাজ উদ্দিন, সুমন রানা, সাঈদ মীর, শাহাবুদ্দিন খন্দকার ওরফে পিন্টু, খসরুল আলম ওরফে খসরু, নবী নেওয়াজ খান, আসাদুজ্জামান লিটন, লিপু সরকার, জুয়েল রানা ওরফে রহিম বাদশা, রাফিদ মাহমুদ রাতুল, ইয়াসিন আরাফাত পাপ্পু এবং আনিসুর রহমান নবু। তারা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।
লাঞ্জু নামে এক আসামির সঠিক নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় এবং বাবু দেওয়ান নামে আরেক আসামি মারা যাওয়ায় তাদের অব্যাহতির আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
তদন্ত কর্মকর্তা ইমরান আহমেদ বলেন, “ভিকটিম বিপ্লবের পরিবারের পক্ষ থেকে সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ৩৮ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। এজাহারনামীয় ৩৬ জনকে এবং তদন্তে প্রাপ্ত ১০ জন, মোট ৪৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। তদন্তে উঠে এসেছে, জুলাই আন্দোলনে ৫ অগাস্ট গুলিবিদ্ধ হয়ে ভিকটিম বিপ্লব মারা গেছে।”
স্থানীয় সংসদ সদস্য, মামলার এজাহারনামীয় ১ নম্বর আসামি সাইফুল ইসলামের হুকুমে ও মদদে আন্দোলনকারীদের হত্যার উদ্দেশ্যে ২ নম্বর আসামি শামীম আহমেদ সুমন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে এজাহারনামীয় অন্য আসামিরা এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকশ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীরা বাইপাইল মোড়ে লাঠিসোঁটা রড, চাপাতি, রামদা এবং বন্দুক ও শটগান নিয়ে অবস্থান নেয়।
“দুপুর ১২টার পর বাইপাইলমুখী একটি মিছিল শুরু হলে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিলে আক্রমণ করে।”
মোসাম্মৎ মেমী তার মামলায় অভিযোগ করেন, ৫ অগাস্ট সকালে বিপ্লব আন্দোলনে যোগ দিতে বাইপাইল এলাকায় যান। দুপুর দেড়টার দিকে মেমী জানতে পারেন, বাইপাইল এলাকায় বিপ্লবের দেহ রাস্তার উপর পড়ে আছে। আসামিদের ছোড়া গুলিতে তার শ্বাসনালী ছিঁড়ে গেছে।
তাকে উদ্ধার করে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজে নিয়ে যাওয়ার পর বিকেল ৪টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিপ্লবের মরদেহ নওগাঁয় দাফন করা হয়।
এক বছর হয়ে গেছে ভাইটা নেই। অনেক খারাপ লাগে। আমিও ঢাকায় চাকরি করতাম। ভাইটা মারা যাওয়ার পর গ্রামে চলে এসেছি।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুনের জন্য দায়ী করে মেমী বলেন, “শেখ হাসিনা আমার ভাই হত্যার সাথে জড়িত। উনারই তো এক নম্বর আসামি হওয়ার কথা। আমি তাকে এক নম্বর আসামি করতে চেয়েছিলাম। একজন সাংবাদিক (নাম বলতে পারেননি) এভাবে আমাকে দিয়ে মামলাটি করিয়েছে। আমি চাই শেখ হাসিনাও মামলার আসামি হোক, তার বিচার হোক।”
জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে কিছু টাকা সহায়তা পাওয়ার কথা জানিয়ে মেমী বলেন, “টাকা দিয়ে কি সব হয়? আমি আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।”
বিপ্লবের মৃত্যুর পর পোশাক কারখানার চাকরি ছেড়ে ৯ বছরের মেয়ে আমেনাকে নিয়ে গ্রামে ফিরে গেছেন স্ত্রী আরিফা। সেখানে মেয়েকে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছেন।
৫ অগাস্টের স্মৃতি মনে করে আরিফা বলেন, “সকালে রান্না করে তিনজন বসে এক সাথে খাওয়া দাওয়া করলাম। তারপর আমি অফিসে চলে গেলাম। আমার মেয়ে তার বাবার সাথে ছিল। আমি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আমার স্বামী আমার ননদকে ফোন দিয়ে বাসায় আসতে বলে।
দোকান বন্ধ ছিল, তাই ও কাজে যায়নি। ননদের কাছে মেয়েকে রেখে আন্দোলনে যোগ দিতে যায়। সুস্থ মানুষটা ঘর থেকে বের হল, ফিরল লাশ হয়ে।”
আরিফা বলেন, “তিনি তো ছিলেন আমাদের মাথার ছাদ। সেই ছাদটা চিরতরে সরে গেছে। কার ভরসায় ঢাকায় থাকব। ছোট একটা চাকরি করতাম। যা বেতন পেতাম তাতে সংসার চলত না। তাই গ্রামে চলে এসেছি, বাবার বাড়িতে উঠেছি।
“শ্বশুর বয়স্ক, অসুস্থ। সে কারণের আর ওইখানে থাকি না। টুকটাক হাতের কাজ করি। আর ও মারা যাওয়ার পর কিছু টাকা সাহায্য পেয়েছি। তাই দিয়ে চলছে। জানি না ভবিষ্যতে কি হবে।”
তিনি বলেন, “তাকে ছাড়া জীবনটা কষ্টে কাটছে। সে থাকলে তো টেনশন ছিল না। সব দায়িত্ব তো তার উপর ছিল। আমি সকালে অফিসে চলে যেতাম। মেয়েটাকে খাওয়ানো, মাদ্রাসায় আনা-নেওয়া, গোসল করানো সবই করত সে।
“মেয়েটা বাবার জন্য কান্নাকাটি করে। সবার বাবা সবাইকে মাদ্রাসায় দিয়ে আসে, নিয়ে আসে। এটা দেখে ওর খুব খারাপ লাগে। কান্নাকাটি করে। আমার মেয়েটাকে যারা এত অল্প বয়সে বাবাহারা করেছে, আমি তাদের বিচার চাই।”












