সোনালী সেদিন!

পর্ব-১
মেঘমালাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম,সেদিনই জীবনে অন্যরকম একটি অনুভূতি এসেছিল। ভাদ্র মাস, পাকা তালগুলো গাছের নিচেই পড়ে আছে। চারিদিকটা পানিতে থৈ থৈ। লেজার পিরিয়ডে বই খাতা পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে প্রাণের হাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠ পেরিয়ে তালগাছটার কোনা থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলো। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে!
এই প্রথম কোন মেয়েকে অন্যরকম ভালো লেগেছিলো। প্রথম কোন বিপরীত জাতিকাকে দেখে অন্যরকমের একটি অনুভূতি কাজ করেছিলো।
স্কুল ঘর থেকে বাড়িতে এসে একদণ্ড সময় নয়।না খেয়ে দৌড়ে গিয়েছিলাম সেই তালগাছ তলায়।
জীবনে এই প্রথম সন্ধ্যা পেরিয়ে বাড়িতে ফেরা। বাড়িতে এসে দেখি লখাই স্যার অপেক্ষা করতেছেন। তার চোখ দুটো মনে হচ্ছিলো রক্তমাখা, লাল টকটকে হয়ে আছে। একবার তাকাতেই নিচু হয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে বই খাতা নিয়ে তার কাছে পড়তে বসা। পড়ায় মন নেই। অংকে ভুল ইংরেজিতে ভুল!ঠাস ঠাস করে আমার হাতের উপরে চারখানা বেতের বারি। কোনো কিছু অনুভবই করলাম না।
চোখের সামনে শুধু লাল ফিতে,সাদা মুজা,আর নীল রংয়ের কামিজ। আমার চোখ থেকে পানি বের হচ্ছিলো চোখের পানি মেঝেতে পড়ছে তার মধ্যেও তাকে দেখছি!আমাদের সময় স্কুলে জোহরের নামাজ পড়াণো হতো।সন্ধ্যায় মাগরিব পড়তে মসজিদে যেতাম নানা বাড়ির কাছে।যতদূর মনে পড়ে শবে বরাতের রাতে মেঘমালা মেঘমালা বলে চিৎকার করছিলাম। নিয়ে সারা পাড়া মহল্লায় কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল আমাকে নাকি জিনে ধরেছে!
সুকুমার স্যার আব্বাকে ডেকে বলেছিলেন ছেলেকে সামলাও। বয়সন্ধিকাল তো। একটু আধটু রকমের করবে। এই সময়টা সামাল দিতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর অনেক কথা। স্কুল জীবন থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেরিয়ে গেল বারোটি বছর। কিভাবে যে সময় চলে যায়? তা উপলব্ধি করার মতো বদ জ্ঞান এই আদমের তৈরি হবে কিনা জানিনা। এক ভয়াবহ গুডগুটে আমার নিসার অন্ধকারে ঘুরপাক খাচ্ছি আমরা। মেঘমালা নিজের ভালোটা বুঝতে গিয়ে জীবনটাকে কারবালা করে ফেলেছিলো!আব্বা সবকিছুতে রাজি হয়েছিলেন, ওর পড়াশোনা,গ্রাজুয়েশন সবকিছুতে।
তবুও তোকে আটকাতে পারিনি পারেনি পথের সামনে থমকে দাঁড়াতে। সিচুয়েশনটা ওরকম ছিলোই ই না!
আমার আর জাহাঙ্গীরনগরে পড়া হলো না।
কি যেন ব্যামো এসে বাঁধলো!
কেমনে কেমনে জানি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লাম সেই ক্লাস টেন থেকে, কিছু জিদ আমাকে প্রতিশোধ পরায়ন করে তুললো!বিনা অপরাধে মানিককে মারা,খেজুরের কাঁটা দিয়ে ওর চোখ উঠে ফেলা , এসব বিচারের নামের প্রহসন কখনোই আমি মন থেকে মেনে নিতে পারতাম না।
একসময় দেশটা একটা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আসলো,স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আসলো আমাদের গ্রামও।
কিন্তু স্বাভাবিক প্রাপ্তিটা হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে !
কেটে গেল আরো ৫-৬ বছর!
আমি তখন টগবগে তুখোর ছাত্র নেতা!
একদিন হঠাৎ করে একটি অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসে।
হঠাৎ অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আশায় কিছুটা বিব্রত হয়। কয়েকবার কল আসার পরে ফোনটা রিসিভ করতেই প্রশ্ন কেমন আছো?
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিলাম- ভালো!
কন্ঠটা চিনতে একটু ভুল হয়নি।
-তুই?
-ভালো, অনেক ভালো আছি,ইচ্ছেমৃত্যুকে বরণ করে নিয়ে যতটা ভালো থাকা যায় আর কী!
-তোর কী খবর?কী করছিস আজকাল?
-ঐ তুই যেটাকে ঘৃণা করতিস,
ঘৃণা নয়,বারণ করতাম।
-ঐ হোলো আর কী,
-না,এছাড়াও তো অনেক কিছু করতেছিস। ইদানীং তোর অনেক নামডাক হয়েছে। পেপার পত্রিকায় বড় বড় ছবি বের হয়।
-তোর এসব দেখার সময় আছে নাকি?
তা তুই কী করিতেছিস?
ঐ হেঁসেল সামলাচ্ছি!বিশাল এক একান্নবর্তী পরিবারের বড় বউ!
-কেনো,খালাম্মাতো বড় পরিবারে তার মেয়ে বিয়ে দেবে না বলেই দিয়েছিলো।তো এই কট্টর স্বীদ্ধান্তের বিপক্ষে গেলি যে?
-কপালে আছে তাই গিয়েছি।
মেঘমালার কন্ঠ টা ভারী হয়ে আসছিলো!
সৃষ্টিকর্তা কী সন্ধি দিতে পারতেন না!
-রাখি রে,বলে ফোনটা কেটে দিলো।
………চলবে।
লেখক-
সাংবাদিক, কলাম লেখক
৮/৮/০৬